বিদআত ও কুসংস্কার

পৃথিবীর শুরু লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি ধর্ম ও প্রতিটি জাতিরই রয়েছে নিজস্ব সভ্যতা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যুগে যুগে সকল ধর্মাবলম্বীরাই নিজ নিজ ধর্মীয় সংস্কৃতি পালন করে আসছে। ইসলাম একটি সার্বজনীন পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ও ধর্ম। এ ধর্মে রয়েছে আল্লাহ্ প্রদত্ত বিশ্ব নবী (সা:) এর নূরানী আদর্শের সমন্বয়ে নিজেস্ব রীতিনীতি ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। যা মানুষকে শেখায় সভ্যতা, নৈতিকতা। বুকে বপন করে মানবতার বীজ আর সুস্থ সংস্কৃতির মাধ্যমে গড়ে তোলে সত্যিকার মানুষ। ইসলাম ধর্মীয় রীতিনীতি ছেড়ে মানুষ যখন অজ্ঞতা বশতঃ অথবা পার্থিব কোন স্বার্থে বিজাতীয় সংস্কৃতি, নিয়ম-নীতি অনুসরণ, অনুকরণ করে তখন তা কুসংস্কারে রূপ নেয়। অতএব, ইসলাম ধর্মে অনুপ্রবেশ করা এ জাতীয় ভিন্ন ধর্মীয় রীতিনীতি, বিজাতীয় সভ্যতা সংস্কৃতি ও মনগড়া নব-উদ্ভাবিত বিষয় যা দ্বীন ইসলামের অংশ মনে করে নেকীর আশায় আবিস্কার বা আমল করা হয় উহাকে শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত বলে অভিহিত করা হয়।

বিদআতের সংজ্ঞা

আরবী অভিধানের প্রাচীনতম প্রসিদ্ধ কিতাব লিসানুল আরব এ আল্লামা ইবনে মনযুর আল আন্দালুসী (রহ:) (মৃত্যু- ৭১১ হি:) উল্লেখ করেছেন

البدعة: الحدث: والبدعة بالكسر= مبتدع فى الخيروالشر-

বিদআত অর্থ নব-আবিস্কৃত বিষয়। ভাল হোক কিংবা মন্দ হোক। লিসানুল আরব ১/৩৪২

ইমাম নববী (রহ:) বলেছেন

البدعة كل شئ عُمل على غير مثال سابق-

পূর্ব নমুনা ছাড়া কোন বিষয় আবিস্কার করার নাম বিদআত।

আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (র:) বলেছেন।

البدعة اصلها مااحدث على غيرمثال سابق-

ভিত্তিহীন কোন জিনিস নতুন করে শুরু করার নাম বিদআত।

আল্লামা তাজউদ্দিন শাফী (র:) মৃত ৮১৬ হি: লিখেন

بدعة بالكسر الحدث فى الدين بعد الاكمال ومااستحدث بعد النبى صلى الله عليه وسلم من الاهواء والاعمال

বিদআত অর্থ দ্বীনের পরিপূর্ণতার পর নবী করিম (সা:) এর ইন্তেকালের পর মনমত আবিস্কার ও ইচ্ছেমত আমল করা হয়েছে।  আলকামুস ৪/২

শরীয়তের পরিভাষায় বিদআত

শরীয়তের পরিভাষায় ইবাদতের ঐ সকল নতুন নিয়ম নীতি ও পদ্ধতিকে বিদআত বলা হয় যা সাওয়াবের উদ্দেশ্যে দ্বীনের অংশ বা কাজ মনে করে করা হয়। যা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) খোলাফায়ে রাশেদীন, সকল সলফে সালেহীন, আয়াম্মায়ে মুজতাহিদীন এর পবিত্র স্বর্ণ যুগের পর আবিস্কার করা হয়েছে।

উল্লেখিত সংজ্ঞা হতে জানা গেল যে, অভ্যাসগত ও দুনিয়াবী প্রয়োজনে যে সকল নতুন নতুন বস্তু বা জিনিস ও ব্যবহারিক পন্থা দৈনন্দিন আবিস্কার হচ্ছে তার সাথে শরয়ী বিদআতের কোন সম্পর্ক নেই। কারণ ঐ সব কর্ম ও জিনিস পত্র কেহ সওয়াবের নিয়তে দ্বীনের অংশ মনে করে আবিস্কার করে না। যা জায়েজ ও বৈধ। যেমন- বাস, ট্রেন, বিমান, ব্রীজ, কালবার্ড, রাস্তাঘাট, লঞ্চ, ষ্টিমার ইত্যাদি যা মানুষের জীবনে প্রয়োজনের ক্ষেত্রে আবিস্কার করে থাকে। তবে কোন শরয়ী বিধানের পরিপন্থি হতে পারবে না।

উল্লেখিত সংজ্ঞা অনুযায়ী এটাও প্রতীয়মান হল, যে সকল জিনিস দ্বীনের সহায়ক হিসাবে আবিস্কার করা হয়। কিন্তু দ্বীনের অংশ মনে করা হয় না। মানতিক শিক্ষা, ফলসাফার কিতাব অধ্যয়ন, জিহাদের জন্য নতুন নতুন সরঞ্জাম আবিস্কার করা, এলমে তাসাউফের আবিস্কার, তাজবীদের নতুন নতুন পদ্ধতি আবিস্কার, মাদ্রাসায় বসার জন্য বেঞ্চ ব্যবহার, ঘর ও বিল্ডিং নির্মাণ, চেয়ার-টেবিল, নিসাব নির্ধারণ, বেল ব্যবহার ইত্যাদি দ্বীনের জন্য আবিস্কার করা হয় অর্থাৎ পৃথিবীতে দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্য যে সকল পন্থা আবিস্কার করা হয় তাহা দ্বীনের অংশ নয় তবে দ্বীনের সহায়ক বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যম। সেই হেতু উহা বিদআতের অন্তর্ভূক্ত নয়। কেননা হাদিসের মধ্যে ধর্মের মধ্যে নতুন সংযোজনকে বিদআত বলা হয়েছে। কিন্তু ধর্মের জন্য নতুন সংযোজনকে বিদআত বলা হয় নাই। মোট কথা নিন্দনীয় বিদআত কেবল মাত্র ঐ সকল নতুন আবিস্কার যা সওয়াবের নিয়তে দ্বীন ইসলামের কাজ বা অংশ মনে করে সম্পাদন করা হয়। যেমন বর্তমান সমাজে মানুষ মারা গেলে ৩,৫,৭ ও ৪০ দিনকে জরুরী মনে করে মৃত ব্যক্তির জন্য প্রীতিভোজের আয়োজন করা, মৃত বার্ষিকী, জন্ম বার্ষিকী এবং বর্তমান সমাজে প্রচলিত মিলাদ এবং সালাম পেশ করার সময় দাঁড়ান ইত্যাদি নেকি বা সওয়াবের আশায় দ্বীনের কাজ মনে করে করা হয়। অথচ উহা বিশ্বনবী (সা:)  সাহাবাগণ, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীনগণ (রহ:) এর যুগে তাহারা এগুলোকে দ্বীনের অংশ বা কাজ মনে করে সম্পাদন করে নাই। বিধায় এগুলিকে নিন্দনীয় বিদআত বলা হয় যার বর্ণনা বিস্তারিত সামনে আসবে ইনশায়াল্লাহ্।

বিদআতের তাৎপর্য

সুন্নাতে নববীর খেলাফ সকল কাজই বিদআত, দ্বীন পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পর তাতে কোন জিনিস সংযোজন করে সওয়াবের আশায় তা পালন করা, না করলে তিরস্কার করা বা গালি গালাজ এমন কি কাফের বলা এই হলো বিদআতের মূল কথা। দ্বীনের মধ্যে বিদআতের প্রচলন হলে আসল দ্বীনই বিকৃত ও পরিবর্তন এমন কি নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশংকা রয়েছে। দ্বীন ইসলাম তো আল্লাহ্ পাকের পক্ষ হতে রাসূল (সা:) এর উপস্থাপিত জিনিস যা স্বচ্ছ নির্ভূল ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। সুতরাং এর মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন বা শামিল করার অর্থ হল, আল্লাহ্ পাক ও তার রাসূল (সা:) যেন বুঝাতেই পারছিলেন না দ্বীন আসলে কিরূপ হওয়া উচিত ছিল। নাউযুবিল্লাহ্

এতদিন পর দ্বীনের মধ্যে নতুন আমল আবিস্কারকদের অর্থাৎ বিদআতিদের এখন বুঝে আসছে তাই তারা নতুন নতুন আমল আবিস্কার করে দ্বীনের অংশ হিসাবে জারী করছে। নাউযুবিল্লাহ্

বিদআতিদের কর্মকান্ডে এটাই প্রমাণ হয় যে, দ্বীনের কিছু জরুরী নেকীর কাজ বাদ পড়েছে যা আল্লাহ্ পাক ও তার রাসূল (সা:) বুঝেন নাই বা বলতে ভুলে গেছেন। (নাউযুবিল্লাহ)

যুগে যুগে যদি মন গড়া নতুন নতুন আমল দ্বীনের মধ্যে সংযোজন হতে থাকে, তাহলে বিবেকবান পাঠকদের প্রতি আমার জিজ্ঞাসা দ্বীনের মূল হুকুম আহকামের অবস্থা কি হবে? অথচ আল্লাহ্ পাক এরশাদ করেছেন

اَلْيَوْمَ اَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِىْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا-

আজ অমি তোমাদের দ্বীনকে (জীবন ব্যবস্থাকে) পরিপূর্ণ করে দিলাম। তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম। মায়িদা- আয়াত- ৩

বিদআতের অপ্রয়োজনীয়তা ও অসারতা প্রতি ইঙ্গিত করে হযরত হুযাইফা তুবনুল ইয়ামান (রা:) বলেছেন

كل عبادة لم يتعبدها اصحاب رسول الله (صـ) فلا تعبدوها فان الاول لم يدع للاخر مقالا –فاتقوا الله يا معشر المسلمين وخذوا طريق من كان قبلكم-

অর্থ যে ইবাদত সাহাবায়ে কিরাম করেন নি সে ইবাদত তোমরা কর না। কেননা পূর্ববর্তীরা পরবর্তীদের জন্য এমন কিছু বাকী রেখে যাননি যা তাদের পূরণ করে দিতে হবে। অতএব হে মুসলিম সমাজ তোমরা আল্লাহ্ পাককে ভয় কর এবং পূর্ববর্তী সাহাবায়েকেরামদের রীতিনীতি অনুসরণ করে চল। আল ইতেসাম ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ১১৩।

বিদআতের প্রকারভেদ ও পর্যালোচনা

সাহাবায়েকেরাম, তাবেঈন, তাবি তাবিঈন, আইয়াম্মায়ে মুজতাহিদিন ও ফুকাহায়েকেরাম এবং উলামায়ে আছলাফের কেউই বিদআতের শ্রেণি বিভক্ত করেননি বরং প্রত্যেক বিদআতই গুমরাহী ও গর্হিত হাওয়ার প্রবক্তা ছিলেন। কারণ দ্বীনের মধ্যে দ্বীন হিসাবে গণ্য করে সওয়াবের নিয়তে নতুন আমল জারী  বা চালূ করাকে বিদআত বলে। উহা যদিও আপাতত: দৃষ্টিতে সুন্দর মনে হয়। কিন্তু ভবিষ্যতে উহার পরিণাম একমাত্র ধবংস ও গঞ্চনা-বঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিদআতের অনুসারীগণ বিদআতকে হাসানা ও সায়িয়্যাহ নামে ভাগ করে থাকে। নিজেদের মনগড়া কাজকে তারা বিদআতে হাসানা বলে দাবী করে থাকে। যার ফলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে বহু নতুন নতুন রুসুমাত সৃষ্টি হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের কাছে গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে। অথচ দ্বীনের মধ্যে নতুন আবিস্কারকে বিদআত বলা হয়, কিন্তু দ্বীনের জন্য নতুন আবিস্কারকে বিদআত বলা হয় না। যেমন হযরত আয়শা (রা:) থেকে বর্ণিত হযরত  রাসূল কারীম (সা:) এরশাদ করেন

من احدث فى امرنا هذا ماليس منه فرد-

অর্থ : যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীন ইসলামের মধ্যে নতুন কিছু আবিস্কার করবে যা দ্বীনের মধ্যে হতে নয়, তা পরিত্যাজ্য। সুতরাং দ্বীনের সহায়ক, প্রচার, প্রসারের জন্য প্রথাগত পদ্ধতি অবিস্কার করাকে বিশ্বনবী (সা:) নিষেধ করেন নাই। বিধায় এগুলি বিদআতের অন্তর্ভূক্ত নয়। অতএব, বিদআতে হাসানা বলতে কিছু নেই। যেমন- বিদআতের এই মনগড়া বিভক্তির প্রতিবাদে হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানী শায়খ আহম্মদ ছেরহিন্দী (রহ:) তেজোদিপ্ত কণ্ঠে সুষ্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন হাদিসে সকল বিদআতকেই গুমরাহী বলা হয়েছে।

كل بدعة ضلالة

পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ, এজমা, কিয়াছের দ্বারা প্রমাণিত আমল কখনই বিদআত নয়। যে সকল আমল উল্লেখিত চার মূলনীতির আওতাভূক্ত না তাহা আপাতত দৃষ্টিতে যত সুন্দরই মনে হোক না কেন বাস্তবে তা গুমরাহী, কখনই হাসানা হতে পারে না।

বিদআতের সূচনা

হাফেজ ইবনে কাসির (র:) (মৃত্যু ৭৭৪ হি:) স্বীয় তাফসিরে ইবনে কাসিরে হাফেজ ইবনে আবি হাতেম (র:) এর সূত্রে রবী ইবনে আনাছ (রা:)  থেকে বর্ণনা করেন যে, এক ব্যক্তি দীর্ঘ দিন যাবৎ খুব ইবাদত করত। সে কুরআন সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসারী ছিল। দীর্ঘদিন ইবাদত বন্দেগী করার পর এক দিন শয়তান এসে তাকে প্ররোচিত করল যে, অতীতের লোকেরা যে সকল আমল করে গেছে তুমিও দেখি সেই সকল পুরাতন আমলই করে চলেছ। এতে কি লোকায়িত আছে? এভাবে অতীতের লোকদের আমল করতে থাকলে জনগণের নিকট তোমার পরিচিতি বা মর্যাদা আসবে না। লোকে তোমাকে চিনবে না। সুতরাং জন সাধারণের নিকট পরিচিতি ও মর্যাদা লাভের জন্য তোমাকে নতুন কিছু আমল আবিস্কার করা দরকার এবং তা জনগণের নিকট প্রচার করতে হবে। তাহলে অতি দ্রুত তোমার প্রসিদ্ধ লাভ হবে এবং জন সাধারণের নিকট তুমি আলোচিত হবে।

সুতরাং লোকটি ছিল আবেদ তাই সে শয়তানের পরামর্শ অনুযায়ী তাই করল। নতুন নতুন জিনিস আবিস্কার করে লোক সমাজে প্রচার করতে লাগল। এভাবে কিছু দিন সে এই কাজে লিপ্ত ছিল। লোক জনও তার অনুসরণ করছিল। এক পর্যায়ে সে অনুতপ্ত হয়ে লোকালয় ছেড়ে নির্জনে গিয়ে ইবাদতে মশগুল হল এবং বিদআত আবিস্কারের মহাপাপ থেকে তওবা করল। কিন্তু আল্লাহ্ পাকের পক্ষ হতে ঘোষণা আসল তুমি একা ভুল করলে তোমাকে ক্ষমা করা হতো, কিন্তু সাধারণ মানুষকেও তুমি পথ ভ্রষ্ট করেছ। তাদের অনেকেই এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে তাদের সকলের দায়ভারও তোমাকেই নিতে হবে। অতএব তোমার তওবা কবুল করা হবে না। ইবনে কাছির সুরা মাইদা, আয়াত ৭৭ এর ব্যাখ্য।

বিদআত উদ্ভাবনের কারণ

ইসলাম একটি সহজ সরল ধর্ম। এ ধর্মের সকল কর্মকান্ড ইবাদত বন্দেগী সাদাসিদা, সহজ সরল। এ ধর্মে খেল তামাশা, অপচয়, অপব্যয়, আনুষ্ঠানিকতা ও প্রথা পালনের কোন স্থান নাই। তবে সৃষ্টিগত ভাবে মানুষ অনুষ্ঠান প্রিয়। কোন আয়োজন অনুষ্ঠান দেখলে মানুষ সেদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর ধর্মের নামে হলে তো কথাই নাই। কিন্তু আফসুসের বিষয় হল, মানবিক এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী প্রবৃত্ত পূজারি আলেম নামধারী কিছু মানুষ ধর্মের নামে বাহ্যিক চাকচিক্যময় মনগড়া বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা রেওয়াজ, রুসুমাত ও কু-প্রথা আবিস্কার করে সরল মনা মানুষদেরকে বিভ্রান্ত করছে। কু-বৃত্তির অনুসরণই বিদআতের মূল কারণ।  কারণ দুনিয়াতে যত ভ্রান্ত মতবাদ আবিস্কার হয়েছে তার প্রধান কারণ শয়তানের ধোকা ও কু-প্রবৃত্তির অনুস্বরণ। এছাড়া বিদআত উদ্ভাবনের অনেক কারণ রয়েছে যা ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। যেমন-

১। সম্পদের লোভ : সামান্য অর্থের লোভে নামধারী কিছু আলেম বিদআত আবিস্কার করেছে।

২।    পদ মর্যাদার লোভ : এক শ্রেণির নামধারী দরবারী আলেমগণ রাজা-বাদশাদের নিকট প্রিয় হওয়ার আশায় তাদের খুশি করার লক্ষে বিভিন্ন ভিত্তিহীন জিনিস আবিস্কার করেছে।

৩।    অজ্ঞতা : কুরআন-সুন্নাহর স্বচ্ছ জ্ঞান না থাকা। ফলে অজ্ঞতা বশতঃ বদ-দ্বীনকে দ্বীন মনে করে আমল করা।

৪। পূর্ব পূরুষদের অন্ধ অনুসরণ : কুরআন-সুন্নাহর প্রতি ভ্রক্ষেপ না করে বাপ-দাদারা যা করেছেন তাহাই সঠিক মনে করে আঁকড়ে ধরে রাখা এবং তাদের বিপরীত কিছু করাকে মহা পাপ ও বেয়াদবী মনে করা। যা নিঃসন্দেহে এটা জাহেলী যুগের মূর্তি পূজার নামান্তর। বর্তমান সমাজের বেদআতিদের দিকে দৃষ্টিপাত করলে এটাই বেশী প্রতীয়মান হয়।

৫।    প্রসিদ্ধতা লাভের প্রবণতা : অনেকে নতুন কিছু আবিস্কার করে নিজেকে পরিচিত ও আলোচিত করতে চায়। যা পরবর্তীতে বিদআতের আকার ধারণ করে।

৬।    দ্বীনি বিষয় নমনীয়তা : শরীয়তের খেলাফ কোন কাজ হতে দেখেও  কোন স্বার্থে তখন নমনীয়তা দেখানো, প্রতিহত না করা। যার ফলে ধীরে ধীরে তা বিদআতে পরিণত হয়।

৭। বিজাতীয় অনুকরণ ও আধুনিকতার প্রতি ধাবিত হওয়া : ভারত উপ- মহাদেশের মুসলিম সমাজে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির অনুকরণে নানা ধরণের কুসংস্কার ও বিদআত অনুপ্রবেশ করেছে। বিশেষ করে বিবাহ শাদীতে যত ধরণের প্রথা পালন করা হয় সব হিন্দু ধর্ম হতে গৃহিত তেমনি ভাবে পহেলা বৈশাখ বর্ষবরণ উপলক্ষে যা করা হয় পুরাটাই হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। এছাড়াও মুসলিম সমাজে প্রচলিত মারাত্বক মারাত্বক কিছু বিদআত চালু হয়েছে যার বিবরণ সামনে আসছে ইনশাল্লাহ্ ।

বিদআতের অশুভ পরিণতি

ক্ষতির দিক দিয়ে বিদআত দুই প্রকার।

১) আক্বিদাগত বিদআত। যাতে লিপ্ত হলে মানুষ ঈমান হারা হয়ে যায়। যেমন- রাসূল (সা:) কে হাজির-নাজির ও আলিমূল গাইব মনে করা।

২)   আমলি বিদআত। যাতে লিপ্ত হলে মানুষ কাফের হয় না বটে কিন্তু অবশ্য ফাসেকে পরিণত হয়। যেমন- প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম, মৃত্যু ব্যক্তির জন্য ৩, ৫, ৭ দিন পালন এবং চেহলাম, মৃত্যু বার্ষিকী, জন্ম বার্ষিকী, খাতনা অনুষ্ঠান, মুখে ভাত অনুষ্ঠান, শবে বরাতের হালুয়া রুটি, ১০ই মুহাররম খিচুরী-পায়েস ও ফিন্নি, ছালাত, ১২ রবিউল আওয়াল, ঈদে মিলাদুন্নবী ও তাজিয়া মিছিল ইত্যাদি।

মোট কথা বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তি উল্লেখিত মারাত্বক দুই ক্ষতির যে কোন একটিতে অবশ্যই পতিত হবেই। এ ছাড়াও উহার মধ্যে দুনিয়া ও আখেরাতের অনেক ক্ষতি রয়েছে। যার মধ্যে হতে কিছু পেশ করা হল।

১) বিদআতির পরিমাণ জাহান্নাম

নবী করিম (সা:) একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষ অংশ বিদআত সম্পর্কে হুসিয়ারী উচ্চারণ করে বলেন-

عن العرباض بن سارية (رضـ)قال قال رسول الله (صـ) اياكم والمحدثاتالامور فان كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة وفى رواية كل ضلالة فى النار-

হযরত ইরবায ইবে সারিয়া (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে আকরাম (সা.) এরশাদ করেছেন তোমরা (দ্বীনি বিষয়ে) সকল নব উদ্ভাবিত জিনিস হতে দুরে থেকো। কেননা প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত জিনিস ও বিষয়ই বিদআত ও গুমরাহী। অন্য রেওয়াতে আছে প্রত্যেক গুমরাহীরই পরিণত জাহান্নাম। আবু দাউদ শরীফ হাদিস নং- ৪৬০৭।

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসুদ (রা:) বলেছেন-

انكم ستحدثون لكم – فكل محدثة ضلالة وكل ضلالة فى النار- الاعتصام٦٥

অর্থ : হে মুসলিম সম্প্রদায় তোমরা অনেক কিছুই নতুন উদ্ভাবন ও আবিস্কার করবে আর তোমাদের জন্যও উদ্ভাবন করা হবে দ্বীন ইসলামের মধ্যে অনেক জিনিস। জেনে রাখ সকল নব উদ্ভাবিত জিসিনই বিদআত ও গুমরাহী। আর সকল গুমরাহীই জাহান্নামী। আল ইতেসাম- ৬৫ পৃষ্ঠা।

 বিদআতের কারণে সুন্নত মিটে যায়-

ما ابتدع قوم بدعة الا رفع الله من سنتهم مثلها لا يعيدها اليهم الى يوم القيامة-

রাসূলে আকরাম (সা:) এরশাদ করেছেন যখন কোন সম্প্রদায় দ্বীনের মধ্যে নতুন কোন আমল আবিস্কার করে, তখন আল্লাহ্ তায়ালা তাদের দ্বীন হতে সম পরিমাণ সুন্নতকে তুলে নেন যাহা কিয়ামত পর্যন্ত আর ফিরাইয়া দেন না। সুনানে দারমী- হাদিস নং- ১০১

 বিদআতির তওবা নসীবে জোটে না

ان الله حجّب التوبة عن كل صاحب بدعة حتى يدع بدعة – طبرانى-

অর্থ : বিদআতী বিদআত পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত আল্লাহ্  পাক তওবাকে প্রাচীর দিয়ে তার জন্য আড়াল করে রাখেন, কাজেই সে তওবা করার ইচ্ছা বা মানুষিকতা থেকেই বঞ্চিত হয়ে যায়। তবরানী পৃঃ নং ৬২

মানুষ বিদআতকে নেক কাজ মনে করে সওয়াবের নিয়তে তা করে থাকে, এটা গোনাহ্ মনে করে না। কাজেই তওবা করার প্রয়োজনও মনে করে না। ফলে শিরক ফিররিছালাত অর্থাৎ বিদআতের মত কবিরা গুণাহকে নেকের কাজ মনে করে করতে করতে তওবা ছাড়াই গুমরাহ্ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে থাকে। নাউযুবিল্লাহ্

عن ابى بكر الصديق ان رسول الله (صـ) قال ان ابليس اهلكتهم بالذنوب  فاهلكونى  بالاستغفار فلما رايت  ذالك اهلكتهم  بالاهواء فهم  يحسبون  انهم      مهتدون فلايستغفرون – كتاب السنة-

হযরত অবু বকর সিদ্দিক (রা:) হতে বর্ণিত রাসূলে আকরাম (সা:) এরশাদ করেছেন, ইবলিশ শয়তান বলে, আমি বনি আদমকে গুনাহের মধ্যে লিপ্ত করে বরবাদ করে দেই। আর তারা আমার সকল প্রচেষ্টা মেহনতকে ইস্তেগফার দ্বারা ধবংস করে দেয়। কাজেই আমি যখন তা অনুভব করলাম তখন আমি তাদের বিদআতে লিপ্ত করে বরবাদ করেদিলাম। অথচ তারা ধারণা করে উহা নেক কাজ এবং হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং তারা তওবা ও ইস্তেগফার করে না। (কিতাবুস সুন্নাহ, হাদিস নং- ৭)

বিদআতির কোন নেক আমল কবুল হয় না।

عن حذيفة (رضـ) قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لا يقبل الله لصاحب بدعة صوما وصلاة ولا صدقة ولا حجا وعمرة ولا جهادا ولا صرفا ولا عدلا يخرج من الاسلام كما تخرج الشعرة من العجين – (ابن ماجة ٦)

হযরত রাসূল আকরাম (সা:) এরশাদ করেছেন, আল্লাহ্ পাক বিদআতির কোন (নেক আমল), রোজা, নামায, সদকা, হজ্ব, উমরা, জিহাদ, নফল, ফরজ ইবাদত কিছুই কবুল করেন না। আটার খামির হতে যেমন সহজে চুল বের হয়ে আসে, অনুরূপ ভাবে ইসলাম থেকে সে বের হয়ে যায়। ইবনে মাজা- ৬ পৃষ্ঠা।

উল্লেখিত হাদিসে বিদআতের ভয়াবহতা এবং পরকালের মারাত্মক ক্ষতির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

বিদআতের উৎস

পূর্ববর্তী সকল ধর্মই অবিকৃত ছিল না। নবী ইন্তেকালের পরেই মুহুর্তের মধ্যেই কোন ধর্ম বিকৃত হয়ে যায়নি। বরং প্রথমে বিদআতের অনুপ্রবেশ ঘটে। ক্রমান্বয়ে তা কুফর, শিরকে রূপ নেয়। ইসলাম ধর্মেও ইতোমধ্যে অনেক বিদআত অনুপ্রবেশ করেছে। বিশেষ করে এশকে রাসূলের নামে অনেক বিদআত আবিস্কার হয়েছে। এশকে রাসূলের মাপ-কাঠি না জানাই এর মূল কারণ। এশকে রাসূলের মাপ-কাঠি ও পদ্ধতির বা নিয়ম নীতি না জেনে আশেকে রাসূল (সা.) দাবীদারদের দ্বারাই বেশীর ভাগ বিদআতের উদ্ভব ঘটেছে। যেমন- রাসূল (সা:) কে মহাব্বতের জোসে আলিমুল গয়িব, হাজির-নাজির, সর্বময় ক্ষমতা ধর আল্লাহ্ পাকের আকার ধারণকারী, নূরের তৈরী বা নূরে মুজাচ্ছাম ইত্যাদি মনে করা। মুহাব্বতের জোসে বর্তমান সমাজে রাসূলের শানে প্রচলিত মিলাদুন্নবী (সা:) ও তার মধ্যে কিয়াম করা এসবই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।

বিদআত সঠিক দ্বীন পরিবর্তনের কৌশল

বিদআতের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে, যদি ইবাদতের মধ্যে মনগড়া নিয়ম, পদ্ধতি, শর্ত চালু করা হয়, তাহলে সঠিক দ্বীন পবির্তন হয়ে যাবে। কেননা কিছুদিন পর আসল এবং নকল সংমিশ্রণ হয়ে সঠিক দ্বীন নির্ণয় করা কঠিন হয়ে এমন এক পর্যায় গিয়ে দাঁড়াবে যে, নকল নিয়মই মানুষ আসল দ্বীন মনে করতে থাকবে। এমন কি উহাকেও বাদ দিতে বা না করলে তাকে কাফের ফতুয়া দেওয়া হবে। যেমন বর্তমান সমাজে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম, ঈদে মিলাদুন্নবী ইত্যাদি  না করলে তাকে কাফের ফতুয়া দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে কেউ নামায, রোজা, হজ্ব, যাকাত, পর্দা বা হালাল, হারাম না মানলে তাকে কাফের ফতুয়া দেওয়া হয় না। নাউযুবিল্লাহ্

ব্যাপারটা স¤পূর্ণ উল্টা হয়েছে। যা হোক পূর্ব যুগের উম্মতগণের মধ্যে দ্বীন পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আসমানি কিতাব ও স্বীয় নবীর প্রদর্শিত ইবাদতের মধ্যে নিজেদের পক্ষ হতে নতুন নতুন নীতি আবিস্কার করা। যাতে সঠিক বা আসল দ্বীন এবং নকল দ্বীনের মধ্যে জন সাধারণের জন্য পার্থক্য করা দুঃসাধ্য হয়ে যায়। আমাদের বর্তমান সমাজের দিকে তাকালেই যা সহজেই বুঝে আসে।

অতএব এজন্যেই হযরত নবী করিম (সা:) শিরক এর পর বিদআত থেকে দুরে থাকার জন্য উম্মতকে বিশেষ ভাবে সাবধান করেছেন। কারণ বিদআত দ্বারা ধর্মের বাস্তব ও সঠিক রূপ রেখা পরিবর্তন হয়ে যায়।

বিদাআতী সম্মানের উপযুক্ত নয়

عن ابراهيم بن ميسرة (رضـ) قال  قال  رسول  الله  صلى الله عليه  وسلم  من  وقرصاحب بدعة فقد اعان على هدم الاسلام – بيهقى

অর্থ : হযরত ইব্রাহিম ইবনে মাইসারা (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, হযরত রাসূল আকরাম (সা:) এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি বিদআতীকে সম্মান করল সে মূলত: ইসলামকে ধবংস করার কাজে সাহায্য করল। বাইহাকী- ৫২৩

বিদআতীর আমল যেহেতু শরীয়ত বহির্ভূত, সেহেতু দ্বীন ইসলাম তার আমল দ্বারা বিকৃত হয় এবং গুনাহকে সে নেকী মনে করে যা কুফুরীর দিকে নিজে এবং জাতিকে ধাবিত করে। যার কারণে সে আল্লাহর নিকট ঘৃণিত হয়। আর আল্লাহ্ পাকের নিকট যে ঘৃণিত হয় তার সম্মান প্রদর্শন করার প্রশ্নই আসে না। এই জন্য রাসুলে আকরাম (সা:) বিদআতীকে সম্মান প্রদর্শন করা দ্বীন ইসলামকে ধ্বংসের সহযোগি হিসাবে সামিল করেছেন।