আদম (আ) কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার

আদম () কে জান্নাত থেকে বহিষ্কার

এবার ইবলীসের হাতে একটা সুযোগ এল। সে আদম ও হাওয়ার অন্তরে এ মর্মে প্ররোচনা ঢেলে দিল এ বৃক্ষই চিরস্থায়ী বৃক্ষ। এর ফল ভক্ষণ করা মানে চিরদিন জান্নাতে অবস্থানের চিশ্চয়তা লাভ। সে কসম করে তাদেরকে এ মর্মে আশ্বস্ত করল সে তাদের মংগলাকাংগী, দুশমন মোটেই নয়। একথা শুনে হয়রত আদম (আ)এ মানব সুলভ মনমানসিকতায় ভ্রান্তির সংযোগ ঘটলো। তিনি ভুলে বসলেন, আল্লাহর উপরোক্ত নির্দেশ শুধু অভিভাবক সুলভ পরামর্শ নয় বরং নিষেধ সূচক একটি নির্দেশ।

শেষ পর্যন্ত তাঁর জান্নাতে চিরস্থায়ী অবস্থান এবং আল্লাহর নৈকট্যে থাকার সংকল্পে শৈথিল্য দেখা দিল। তিনি ফল ভক্ষণ করলেন। সাথে সাথে তাঁর মানবিক বৈশিষ্ট্যতা প্রকাশ পেতে আরম্ভ করল। দেখলেন, তিনি বিবস্ত্র, পোশাক পরিচ্ছদ থেকে বজ্ঞিত। সত্বর উভয়ে (আদম ও হাওয়া)গাছের পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান ঢাকতে আরম্ভ করলেন। এখান থেকেই যেন মানব সভ্যতার সূচনা। কেননা তারা দেহ আচ্ছাদনের জন্য এই প্রথমবারের মত বৃক্ষের পাতা ব্যবহার করলেন।

একদিকে এ ঘটনা, অপরদিকে আল্লাহ তাআলার মাস্তি নাযিলের সূচনা। আদম (আ) কে জিজ্ঞেস করা হলো, নিষেধ সত্ত্বেও কেন এ অমান্যতা? আদম তো শেষ পর্যন্ত আদমই-আল্লাহর অনুগৃহীত ব্যক্তি-তাই ইবলীসের মত তর্ক বিতর্ক করলেন না,উল্টাসোজা কথা বলে নিজের দোষ ঢেকে ফেলার চেষ্টা করলেন না, কোনরূপ কৃতঙ্গতাও প্রকাশ করলেন না, বরং সলজ্জ ও বিনীতভাবে স্বীকার করলেন ভুল তার নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু এর কারণ অবজ্ঞা প্রদর্শন বা দাম্ভিকতা নয়, বরং মানব হিসাবে স্বভাবগত ভুলত্রুটিই এর কারণ। তবু তো ভুল ভুলই। তাই তিনি অনুশোচনার সাথে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে মাফ করলেন। তবে সেই সময় এসে গিয়েছিল যখন আদম (আ) আল্লাহর দুনিয়ার প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করলেন। তাই আদমকে সঙ্গে সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেয়া হল, তোমাকে এবং তোমার বংশধরকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পৃথিবীতে অবস্থান করতে হবে। তখন তোমাদের দুশমন ইবলীসও তার শত্রুতার যাবতীয় উপাদান নিয়ে সেখানে উপস্থিত থাকবে।

সেখানে তোমাকে প্রকৃষ্টতা ও ধৃষ্টতা- এ দুটি শক্তির মধ্যস্থলে জীবন কাটাতে হবে। এমতাবস্থায় তুমি ও তোমার বংশধর যদি নিজেদেরকে আল্লাহর খাঁটি দাস এবং সত্যিকার প্রতিনিধিরূপে প্রমাণিত করতে পার তবে তোমাদের মূল বাসস্থান জান্নাত, চিরদিনের জন্য পুনরায় তোমাদের অধিকারে এসে যাবে। অতএব তুমি এবং হাওয়া উভয়ে এখান থেকে চলে যাও এবং পৃথিবীতে গিয়ে বসবাস কর এবং নিজেদের নির্দিষ্ট জীবন কাল‘ সেখানে আল্লাহর অনগত দাসরূপেই অতিবাহিত কর।

এভাবেই মানব জাতির পিতা ও আল্লাহর খলীফা আদম (আ) তাঁর জীবন সঙ্গিনী হাওয়াকে নিয়ে আল্লাহর পৃথিবীতে পা রাখলেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহর বর্ণনা-

অর্থাৎঃ এবং আমি বললাম, হে আদম, তুমি ও তোমার সঙ্গিনী জান্নাতে বসবাস কর এবং যথা ও যেথা ইচ্ছা ভক্ষণ কর, কিন্তু এ বৃক্ষের কাছাকাছি হয়ো না; হলে তোমরা অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু শয়তান তা হতে তাদের পদস্থল ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল সেখান থেকে তাদেরকে বহিস্কৃত করল। আমি বললাম, তোমরা একে অন্যের দুশমনরূপে নেমে যাও, পৃথিবীতে কিছুকালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইলো।

অতপর আদম তার প্রভুর কাছ থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হল। আল্লাহ, তাঁর প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমা পরবশ, পরম দয়ালু।

আমি বললাম, তোমরা সকলেই এ স্থান থেকে নেমে যাও। পরে যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের কোন নির্দেশ আসবে তখন যারা আমার সৎপথের নির্দেশ অনুসরণ করবে তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না। (সূরাঃবাক্বারাহ, আয়াত ঃ৩৫-৩৮)

অতপর তাদের উভয়ের লজ্জাস্থান, যা গোপন রাখা হয়েছিল তা, প্রকাশ করবার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, গাছে তোমরা উভয়ে মালায়েকা হয়ে যাও কিংবা তোমরা স্থায়ী হও তাই তোমাদের প্রভু এই বৃক্ষ সম্বন্ধে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন।

অর্থাৎঃ সে (শয়তান) তাদের উভয়ের কাছে কসম করে বললো, আমি তোমাদের হিতা কাংখীদের একজন। এইভাবে সে তাদেরকে প্রবন্চিত করল। তারপর যথন তারা সেই বৃক্ষফলের আস্বাদ গ্রহণ করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়লো এবং তারা উদ্যানপত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগলো, তখন তাদের প্রভু তাদেরকে সম্বোধন করে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি? তারা বললো, হে আমাদের প্রভু আমরা নিজেদের প্রতি অত্যাচার করেছি, যদি তুমি আমাদেরকে ক্ষমা না কর তবে অবশ্য আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের শামিল হব। তিনি বললেন, তোমরা একে অন্যের দুশমনরূপে নেমে যাও এবং পৃথিবীতে কিছু কালের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইলো। তিনি বলূলেন, সেখানেই তোমরা জীবন-যাপন করবে, সেখানেই তোমাদের মৃত্যু হবে এবং সেখান থেকেই তোমাদেরকে বের করে আনা হবে। (সূরাঃ আ‘রাফ, আয়াতঃ ২১-২৫)

আমি তো, ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দান করেছিলাম, কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল। আমি তাকে সংকল্পে দৃঢ় পাই নি। স্মরণ কর, যখন ফেরেশতাদেরকে বললাম, আদমের প্রতি নত হও, ইবলীস ছাড়া তখন সকলেই নত হল। সে অমান্য করল। অতপর আমি বললাম, এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর দুশমন, সুতরাং সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাতে থেকে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা দুঃখকষ্ট পাবে। তোমার জন্য এটাই রইলো তুমি জান্নাতে ক্ষুধার্ত হবে না এবং নগ্নও হবে না, এবং সেথায় পিপাসার্ত হবে না এবং রৌদ্রক্লিষ্টও হবে না।

অতঃপর শয়তান তাঁকে কুমন্ত্রণা দিল, সে বললো, হে আদম, আমি কি তোমাকে বলে দেব অনন্ত জীবনপ্রদ বৃক্ষের কথা ও অক্ষয় রাজ্যের কথা? অতপর তারা ওর (বৃক্ষের) ফল ভক্ষণ করল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা উদ্যানের বৃক্ষপত্র দ্বারা নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগলো। আদম তার প্রভুর অবাধ্য হল, ফলে সে পথভ্রষ্ট হল।

অতপর তাঁর প্রভু তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর প্রতি ক্ষমা পরবশ হলেন এবং তাকে পথ নির্দেশ করলেন, তিনি বললেন, তোমরা একে অপরের দুশমনরূপে একই সঙ্গে জান্নাত থেকে নেমে যাও। পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ আসলে যে আমার পথ অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না এবংদুঃখ কষ্ট পাবে না।(সূরা
ত্বা-হা,আয়াতঃ১১৫-১২৩)

তাওরাত ও ইন্জিলে (বাইবেলে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাপ ময়ূরের কাহিনী বা এ জাতীয় অপর যেসব উপাখ্যান ব্যক্ত করা হয়েছে তার উল্লেখ পবিত্র কুরআন বা সহীহ হাদীসের কোথাও নেই। এসব সম্পর্কে শরীয়তের সিদ্ধান্ত কি?এসব ইসরাইল কাহিনী সম্পূর্ণ বানোয়াট মনগড়া। এসবের ভিত্তি না ইলমে সহীহ (অহী লব্ধ ইলম) –এর উপর প্রতিষ্ঠিত,আর না এসব বিবেক বুদ্ধি ও ইতিহাস দ্বারা সমর্থিত। কোন কোন মুফাসসির এসব কাহিনীকে অবাধে বর্ণনা করে থাকেন। যার মারাত্মক কুফল এ শুধু সাধারণ মানব নয় বরং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও এধারণা করে বসেন, অপরাপর ইসলামী বর্ণনার মত এসবেরও বুঝি কোন সঠিক ভিত্তি রয়েছে। অতএব শুধু কুরআনের তাফসীরে নয়, বরং সীরাত (জীবনীমূলম) গ্রন্থেও এসব কাহিনীর উদ্বৃতি না থাকা একান্ত প্রয়োজন।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রশ্ন হতে পারে যে, ময়ূর ও সাপ এর সাহয্য না নিলে ইবলীসকে যখন অভিশপ্ত করে জান্নাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হল তখন কিভাবে সে আদম ও হাওয়াকে পদস্থলিত করতে সক্ষম হলো? উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে এর দুটি সু-উত্তর দেয়া হয়েছে। যেমনঃ

(ক) ইবলীসকে স্বর্গ থেকে বহিষ্কার করে দেয়া হয়েছিল সত্য, তবে একজন গুনাহগার ও নগণ্য সৃষ্টি হিসাবে তার স্বর্গে প্রবেশের পথে কোন প্রতিবদ্ধকতা ছিল না। অতএব সে হিসাবেই সে স্বর্গে প্রবেশ করে আদম ও হাওয়ার সাথে আলাপ সালাপ করে এবং তাদের পদস্থলন ঘটায়। ইহবিতু মিনহা জামিয়ান অর্থাৎ, তোমরা সকলেই এখান থেকে নেমে যাও- আয়াতটিও একথাই সমর্থান করেছে একজন পাপী হিসাবে তখন পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ, তার জন্য নিষিদ্ধ ছিল না।

(খ) যেমন টেলিফোন ও রেডিওর মাধ্যমে একটি শব্দ থেকে দুরান্তে পৌছতে পারে কিংবা ওয়ারলেসে শুধূ ইথারের মাধ্যমে যেমন একটি খবর শত-সহস্র মাইল দূরেও পৌছানো যায় ঠিক তেমনি এটাও কেন সম্ভব হবে না কাছে বসে কিংবা সামনা –সামনি সম্বোধন ছাড়াই শয়তানের প্ররোচনা মানবের হৃদয় পর্যন্ত পৌছাতে পারে এবং তাকে প্রভাবিতও করতে পারে। অতএব এ পেক্ষিতে বলা যায়, শয়তান জান্নাতের বাইরে থেকেও হযরত আদম (আ) ও হযরত হাওয়ার (আ) হৃদয়কে প্ররোচিত করেছিল এবং তাদেরকে পদস্থলিত করার চেষ্টা করেছিল ফাওয়াস ওয়াসা লাহুমাশ শায়তান অর্থাৎ, শয়তান তাদের উভয়কে প্ররোচনা দিয়েছিল। আয়াতটি একথাই সমর্থন করছে।

ইউক্রেন দখলের দ্বারপ্রান্তে রুশ বাহিনী

বিশ্বের সর্বোচ্চ পতিতাবৃত্তির দেশ

আমাদের চ্যানেল ভিজিট করুন

Spread the love

Leave a Comment