পরামর্শ করার গুরুত্ব ও নিয়ম – মাশওয়ারা কি?

পরামর্শ করার গুরুত্ব ও নিয়ম: মাশওয়ারা বা পরামর্শের গুরুত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা’আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন যেমন মানুষ সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের সাথে পরামর্শ বা মাসোয়ারা করেছিলেন তাবলীগের ভাষায় মাশওয়ারা কাকে বলে এবং কিভাবে করতে হয় এর গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করা হলো।

মাশওয়ারার গুরুত্বঃ

আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,

 فبما رحمة من الله لنت لهم و لو كنت فظا غليظ القلب لانفضوا من حولك فاعف عنهم و

   استغفرلهم و شاورهم فى الامر فاذا عزمت فتوكل على الله ان الله يحب المتوكلين-

অর্থঃ আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন। অতপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন তখন আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করুন।

আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালো বাসেন। যদি আল্লাহ তোমাদের সহায়তা করেন, তাহলে কেউ তোমাদের উপর পরাক্রান্ত হতে পারবেনা। আর যদি তিনি সাহায্য না করেন, তবে এমন কে আছে, যে তোমাদের সাহায়্য করতে পারে? আর আল্লাহর উপরই মুসলমানগণের ভরসা করা উচিত। (সূরা আলে ইমরান-১৫৯-১৬০)

অন্য আয়াতে এরশাদ করেন, 

 و امرهم شورى بينهم          

অর্থ:- এবং তারা পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করে। (সূরা আশ-শুরা ৩৮)

হযরত সুলাইমান আ. যখন রাণী বিলক্বীসকে চিঠি দিয়েছিলেন, তখন সে পরিষদবর্গদের সাথে পরামর্শ করেছিল। হতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা এই পরামর্শের কারণে তাকে হেফাজত করেছিলেন এবং  হেদায়েত দিয়েছিলেন।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

   قالت يايها الملؤ افتونى فى امرى  ما كنت قاطعة امرا حتى تشهدون  قالوا نحن اولوا قوة و 

   اولوا بأس شديد و الامر اليك فانظرى ماذا تأ مرين-

অর্থঃ- সেই নারী বলল, হে পরিষদবর্গ! আমার সমস্যায় তোদের অভিমত দাও। আমি কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিনা তোমাদের পরামর্শ ব্যতীত।

তারা বলল, আমরা তো শক্তিশালী ও কঠোর যোদ্ধা, তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই, কী আদেশ করবেন তাহা আপরি ভেবে দেখুন। সুরা নাম্ল. ৩২-৩৩

অন্য দিকে ফির‘আওন পরামর্শ ছাড়ায় সিদ্ধান্ত নিলো, সে বলল, 

   قال فرعون ما اريكم الا ما ارى و ما اهديكم الا سبيل الرشاد-

আমি যা বুঝি, আমি তোমাদেরকে তাই বলিতেছি। আমি তোমাদেরকে কেবল সৎপথই দেখিয়ে থাকি। (সুরা:- আল-মু‘মিন.২৯)

মাশওয়ারার বিষয় বস্তু তিনটি:-

১. জামাতের প্রত্যেকটি সাথী কিভাবে ইমানওয়ালা, আমলওয়ালা, মুখলেছ, মুজাহিদ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে, বা প্রত্যেক সাথী কিভাবে জ্ঞানী-গুণী, কর্মট, মুখলেছ, মুজাহিদ ও দ্বীনের দায়ী বনতে পারে সে ব্যাপারে চিন্তা ফিকির করা।

২. কিভাবে মেহনত করলে এই মহল্লার প্রত্যেকটি ঘর থেকে একএক জন বালেগ পুরুষ বারীবারী করে নগদ আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে, বা একটি নগদ জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের হতে পারে এ ব্যাপারে চিন্তা ফিকির করা।

৩. এই মসজিদে যদি পাঁচ কাজ চালু না থাকে তাহলে চালু করা, আর যদি চালু থাকে তাহলে মজবুত করা, আর যদি মজবুত থাকে তাহলে তা থেকে ফায়দা উঠানোর চিন্তা ফিকির করা।

উক্ত তিনটি বিষয় কিভাবে বাস্তায়ন হয় এ ব্যাপারে আমীর সাহেব সকল সাথীর থেকে খেয়াল নিবে এবং সকল সাথীর মুখ খোলাবে।

মাশওয়ারার আদব:

লোক কম হলে গোলাকারে বসবে, আর বেশী হলে মজমা আকারে বসবে।

একজন আমীর নিযুক্ত করবে, চলতি জামাতে তো আমীর নিযুক্তই আছে।

আমীর আকেল, বালেগ ও পুরুষ হওয়া।

আমীর সাহেবের ডান দিক থেকে খেয়াল বা রায় নেওয়া। দ্বীনের ফায়দার দিকে লক্ষ রেখে খেয়াল দেওয়া। নিজের রায় নিজে পেশ করা। অন্যের রায় না কাটা। নিজের রায়ের উপর ইসরার বা পিড়াপিড়ি  না করা, অন্যের রায়কে ছোট মনে না করা, মাশওয়ারার পূর্বে মাশওয়ারা না করা, এবং পরে সমালোচনা না করা।

মাশওয়ারার সময় কোন ইনফেরাদী আমল না করা, আমীর সাহেব সকল সাথীর থেকে রায় বা কিছু সাথীর রায় নিয়েও ফায়সালা দিতে পারেন, আবার কাহারও থেকে রায় না নিয়েও ফায়সালা দিতে পারেন, আমীর সাহেব যা ফায়সালা দেন তার উপর জমে যাওয়া। মাশওয়ারার সময় চিল্লা-চিল্লি না করা, বরং আখলাকের পরিচয় দেওয়া।

মাশওয়ারার লাভ:

আল্লাহর হুকুম ও নবীর সুন্নাত জিন্দা হয়, জোড়-মিল ও মহব্বত হয়, খায়ের ও বরকত হয়, ক্ষতি থেকে হেফাজত হয়, আল্লাহর রহমত থাকে, আল্লাহ তায়ালার ফায়সালাকৃত আযাব উঠিয়ে নেন ও লজ্জিত হতে হয়না।

মাশওয়ারার পর প্রয়োজন থাকলে খেদমতের সাথীরা খেদমতে চলে যাবে, আর দুই-তিন জন সাথী খুছূছী গাশ্তে যাবে, আর বাকী সাথীরা তা‘লীমে বসে যাবে বা যা ফায়সালা হয় তা করবে।

খেদমত:

খেদমত অনেক বড় নেকীর আমল, এর দ্বারা অহংকার দূর হয়, বিনয়ী আসে, জামাতের খেদমত করা নবীজীর সুন্নাত।

চার আমলের সাথে খেদমত করবে, যথা:- দাওয়াত, তা‘লীম, নামায ও জিকির।

সবচেয়ে উত্তম খেদমত হলো, নির্দিষ্ট টাকার মধ্যে উত্তম ও মজাদার খানা পাকিয়ে সময় মত সাথীদের সামনে পেশ করা।

যেহেতু জামাতের মধ্যে কোন পেশাদার বা বেতনভুক্ত বাবুর্চি থাকে না বরং সবাই আল্লাহর জন্য কষ্ট করে যেমনে পারে তেমনেই রান্না করে এজন্য খানা যদি কোন সাথীর রুচি সম্মত না হয় তাহলে কোন সাথী খেদমতের সাথীদেরকে রাগ করবে না বা ভালো মন্দ কিছু বলবে না বরং আরো উৎসাহ দিবে, এবং কোন সাথী কিছু বললেও খেদতের সাথীরা আল্লাহর জন্য সহ্য করবে।

খুছুছী গাশ্ত বা বিশেষ গাশ্তঃ

যেহেত এই গাশ্ত বিশেষ বিশেষ তিন শ্রেণীর লোকদের নিকট যেমনঃ- দ্বীনের বড়, দুনিয়ার বড়, ও কাজের বড় , করা হয় এজন্য এগাশ্তকে খুছূছী গাশ্ত  বলে।

১. দ্বীনের বড় যেমনঃ- উলামায়েকেরাম, পীর মাশায়েখ, ইমাম ও মুয়ায্যিনদের নিকট।

গাশ্ত করার নিয়মঃ-

জামাতের মধ্যে এধরণের সাথী থাকলে তাদেরকে উক্ত ব্যক্তিদের নিকট পাঠাবে, আর না থাকলে যে কোন বুঝমান সাথীদেরকে পাঠাবে।

উলামায়েকেরামের সহিত যিয়ারতকে ইবাদত মনে করবে,তাদের নিকট দোয়া নেওয়ার নিয়তে যাবে, স্বাক্ষাতের জন্য মওকা বা সময়-সুযোগ বুঝে যাবে, যে কোন সময় গিয়ে তাদেরকে বিরক্ত করবে না। সম্ভব হলে ব্যক্তিগত ভাবে কিছু হাদীয়া নিয়ে যাবে। কামরা বা রুমে প্রবেশের অনুমতি নিবে, সালাম দিবে, মুসাফাহার জন্য হাত বাড়াবে না বরং তিঁনি হাত বাড়ালে মুসাহাফা করবে।

অনুমতি ছাড়া  কোথাও বসবে না, বরং দাঁড়িয়ে থাকবে বা কোথাও বসতে বললে সেখানে বসবে, নিজের পক্ষ থেকে কোন কথা বা কারগুজারী বলবেনা, বরং তিনি যদি কোন কিছু জিজ্ঞাসা করেন তাহলে শুধু তাই বলবে, অতিরিক্ত কোন কিছু বলবে না। জুতা সুজা করে দিবে, মসজিদের নিকট বাসা হলে খেদমত করার চেষ্টা করবে, 

সম্ভব হলে খানাতে শরীক করবে,তাদের থেকে ইল্মী ও আমলী ফায়দা উঠাবে যেমনঃ- তাদের আমল দেখে আমল শিক্ষা করবে এবং তাদের নিকট আদবের সহিত মাসয়ালা জিজ্ঞাসা করবে, এবং সম্ভব হলে বলবে যে, হুজুর! আমরা তো কিছুই জানি না আপনার যদি সময় থাকে তাহলে আমাদেরকে কিছু নছীহত করলে আমাদের অনেক উপকার হতো। অতপর বিদায়ের সময় দোয়া চেয়ে সালাম দিয়ে আসবে।

২. দুনিয়ার বড়, অর্থাৎ এলাকার গণ্য-মাণ্য যেমনঃ- মেম্বার, চেয়ারম্যান, মাতুব্বার প্রভিতি লোকদের নিকট গাশ্ত করা।

গাশ্ত করার নিয়মঃ

জামাতে এধরণের সাথী থাকলে নতুন-পুরাতন মিলিয়ে দুই-তিনজন সাথীকে তাদের নিকট পাঠাবে।

তাদের কাছে গিয়ে সালাম মুছাফা করে সংক্ষিপ্ত পরিচয় আদান প্রদান করবে।

অতপর বলবে, আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ তায়ালা আপনাকে দুনিয়াতে অনেক উজ্জত-সম্মান দান করেছেন, তো আমরা চাই যে, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে যেমন দুনিয়াতে উজ্জত-সম্মান দান করেছেন তেমনি আখেরাতেও আল্লাহ তায়ালা উজ্জত-সম্মান এবং কামীয়াবী দান করেন।

সাহেব! আপনার নিকট অনেক মানুষ আসে, এবং আপনার অনেক মানুষের সাথে উঠা-বসা আছে, তো আপনি যদি তাদেরকে মসজিদে পাঠিয়ে দিতেন তাহলে তাদেরও ফায়দা  হতো,আর আপনিও এর নেকী পেয়ে যেতেন,আর যদি আপনার সময়-সুযোগ হয় তাহলে আপনিও আসার চেষ্টা করলে আল্লাহ তায়ালা অনেক খুশী হবেন।

তাদের নিকট গিয়ে দুনিয়াবী কোন প্রভাবে প্রভাবিত না হওয়া। দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গিয়ে দুনিয়ার দাওয়াত নিয়ে না আসা।

তাদের নিকট থেকে এসে বেশী-বেশী এস্তেগফার পাঠ করা যাতে দুনিয়ার কোন প্রভাব আমাদের অন্তরে না বসে।

৩. কাজের বড়ঃ- অর্থাৎ তাবলীগের পুরাতন সাথীদের নিকট গাশ্ত করা।

 যেমনঃ- এক চিল্লা, তিন চিল্লাওয়ালা সাথীদের নিকট যাওয়া।

গাশ্ত করার নিয়মঃ-

নতুন-পুরাতন মিলে দুই-তিন জন সাথী তাদের কাছে যাবে, দেখা হলে সালাম দিবে ও মুছাফাহা করবে এবং কেমন আছেন বা কি অবস্থায় আছেন তা জিজ্ঞাসা করবে।

অতপর বলবে যে, আলহামদুলিল্লাহ আপনারা দেশে-বিদেশে অনেক কুরবানীর সাথে অনেক মেহনত করেছেন এবং আল্লাহর নিকট চোখের পানি ফেলে কান্না-কাটি করেছেন, যার ফলে বিভিন্ন যায়গা থেকে অনেক জামাত আল্লাহর রাস্তায় বেশীর থেকে বেশী সময় নিয়ে বের হচ্ছে, অনুরূপ ভাবে আপনাদের মসজিদেও একটি জামাত এসেছে।

অতপর জামাতের হালাত শুনাবে। এবং একথা বলবে যে, আমরা আপনাদের মহল্লায় কি ভাবে বেশীর থেকে বেশী মেহনত করতে পারি এব্যাপারে আপনি জামাতের নিকট গিয়ে পরামর্শ দিলে খুব ভালো হতো। একথা বলে তাকে নগদ মসজিদে আসার জন্য খুব চেষ্ট করবে। বিশেষ কোন কারণে তখন না আসতে পারলে  সে কখন আসতে পারবে তা জেনে আসবে এবং তার মোবাইল নাম্বার নিয়ে আসবে। এবং উক্ত সময় না আসলে তার নিকট পুনরায় যাবে। 

সুতরাং পুরাতন সাথী আসলে তাদের সাথে পরামর্শ করে কাজের তরতীব বানিয়ে নিবে এবং উক্ত মহল্লার কাজের হালাত জানবে যে, এমহল্লায় কত জন সালের, কতজন তিন চিল্লার ও কতজন একচিল্লার সাথী আছেন, তাদের নাম লিষ্ট করে তাদের নিকট গাশ্ত করবে, এবং কোন কোন সাথী                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                        আল্লাহর রাস্তায় যেতে চেয়ে ছিলেন কিন্ত যে কোন সমস্যার কারণে যেতে পারিনেয় তাদের নাম নিয়ে তাদের পিছনে মেহনত করে তাদেরকে নগদ আল্লাহর রাস্তায় বের করার চেষ্টা করবে।এবং উক্ত মসজিদের পাঁচ কাজের হালাত শুনে সে অনুযায়ী পাঁচ কাজের উপর মেহনত করবে, ইত্যাদি।

সফরের নিয়ম

মনজিল করার নিয়ম

যৌন তত্ত্ব

গোপন মাসাআলা

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Spread the love

Leave a Comment