ভ্যালেন্টাইন’স দিবস পালনের বিধান – ভ্যালেন্টাইনস ডে কি?

ভ্যালেন্টাইনস ডে কি? এ দিবস উদযাপনের প্রভাব ও পরিণাম কি? মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য এর প্রতিরোধে করণীয় কি? এই তিনটি পয়েন্ট সম্পর্কে আমি আলোচনা করব । এই দিবসের ঐতিহাসিক ভিত্তি কোথায়? গবেষক এবং লেখকদের গবেষণার আলোকে দেখা যায়- যীশু খ্রীষ্টের জন্মের আগে চতুর্থ শতকে পৌত্তলিক, মূর্তিপূজারীদের সমাজে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। তারা বিভিন্ন দেবতাকে পূজা করত, তাদের বিভিন্ন দেবতা ছিল, পশু-পাখীর জন্য একটি দেবতাকে তারা কল্পনা করত । জমির উর্বরতার জন্য একটি দেবতাকে তারা বিশ্বাস করত । দেবতার নাম হচ্ছে ‘লুপারকালিয়া’ । এই দেবতার সম্মানে তারা একটি অনুষ্ঠান করত । এই অনুষ্ঠানের একটি কর্মসূচী ছিল, যুবতীদের নামে লটারী ইস্যু করা হত ।

লটারীতে যে যুবতী যে যুবকের ভাগে পড়ে আগামী বছর এ দিন আসা পর্যন্ত সে যুবতীকে যুবক ভোগ করত। অর্থাৎ লটারির মাধ্যমে যুবতীদেরকে বন্টন করা হত । আগামী বছর লটারি না দেওয়া পর্যন্ত যুবতী এই যুবকের সাথে থাকবে । সেদিন দেবতার নামে পশু উৎসর্গ ও জবাই করা হত । জবাইকৃত ছাগলের চামড়া তুলে যুবতীর গায়ের মধ্যে জড়িয়ে দেয়া হত । তারপর ছাগলের রক্ত এবং কুকুরের রক্ত রঞ্জিত একটি চাবুক যুবকের হাতে দেয়া হত । যুবক সে এই চাবুক দিয়ে চামড়া পরিহিতা যুবতীকে আঘাত করত, তারা মনে করত, চাবুকের আঘাতের কারণে যুবতীটি সন্তান জন্ম দেয়ার উপযুক্ত হবে । আর এই অনুষ্ঠানটি পালিত হত ১৪ই ফেব্রুয়ারী । এর পরে খৃষ্ট ধর্ম আবির্ভূত হল । খৃষ্টধর্ম ছিল ‘আহলে কিতাবের’ ধর্ম । ইঞ্জিলের ধর্ম ।

কাজেই এই জাতীয় পৌত্তলিক কু সংস্কারকে আসমানী ধর্ম হিসেবে খ্রীষ্টান ধর্ম সমর্থন করতে পারে না । এজন্য তারা এই প্রথা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করল । কিন্তু তারা এ প্রথাকে রোধ করতে পারল না । তখন তারা এই অনুষ্ঠানকে বিশুদ্ধ করার চেষ্টা শুরু করল । অনুষ্ঠান ঠিক থাকবে, তবে একে একটু বিশুদ্ধ করা হবে। কিভাবে বিশুদ্ধ করা যায়? তারা বলল যে, আগে অনুষ্ঠানটি ছিল দেবতার নামে। এখন হউক পাদ্রীর নামে। যুবতীর নামে লটারি বন্ধ করা হল। পাদ্রীর নামে লটারী দেয়া হল, যে যুবকের ভাগে যে পাদ্রীর নাম আসে সে যুবক পাদ্রীর সুহবতে বা সংস্পর্শে এক বছর অতিবাহিত করবে । অনুষ্ঠানের ধরণ পরিবর্তন হল ।

আগে ছিল যুবতীকে লটারির মাধ্যমে যুবকদের মাঝে বন্টন করা হত এবং যুবক ভোগ করত । এবার অনুষ্ঠানকে পবিত্র করার জন্য পাদ্রীর সুহবতে যুবকদের দেয়া হত। যাতে পাদ্রীর কারণে যুবকদের চরিত্র ভাল হয়। ৪৭৬ সনে পোপ জেলিয়াস বললেন, দিবসের নাম পরিবর্তন করা দরকার। আগে ছিল একজন দেবতার নামে এটা পরিবর্তন করে তাদের একজন যাজক যার নাম ছিল ভ্যালেন্টাইন, তার সম্মানে দিবসটি পালন করা হউক । ৪৯৬ ইংরেজীতে এই দিবসের নামকরণ করা হল ভ্যালেন্টাইন’স ডে।

ভ্যালেন্টাইন কে?

প্রশ্ন জাগে ভ্যালেন্টাইন কে? খৃষ্টানদের ইতিহাসে পঞ্চাশজনের মত ভ্যালেন্টাইন নামক ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। তবে দুজন ভ্যালেন্টাইন অত্যন্ত বিখ্যাত যাদের নাম খৃষ্টানদের ইতিহাসে আমরা খুঁজে পাই। একজন ভ্যালেন্টাইন সম্পর্কে জনৈক ইসলামী চিন্তাবিদ তার এক আর্টিকেলে লিখেছেন, এই ভ্যালেন্টাইন হল

সে ভ্যালেন্টাইন যাকে রোমান রাজারা কারাবন্দী করেছিল। তিনি অন্তরীন হওয়ার পর কারাগারের প্রধান রক্ষকের মেয়ের প্রেমে পড়েন, মেয়ের সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতেন। মৃত্যুর পূর্বে তার জন্য যাজক একটি চিরকুট লিখে যান । এই জন্য এই যাজক খৃষ্টান সমাজে ‘প্রেমিকদের যাজক’ হিসাবে খ্যাতি লাভ করেন । প্রেমিকদের যাজক ভ্যালেন্টাইন ১৪ ই ফেব্রুয়ারী মারা যাবার পর তার মৃত্যু বার্ষিকী পালন করা হয়। আর এই দিনের নাম রাখা হয় ‘ভ্যালেন্টাইন’স ডে’।”

ভিন্ন কথা

আমেরিকার বিভিন্ন স্কুলে ভ্যালেন্টাইন’স ডের যে ইতিহাস লেখা হয়েছে তার আলোকে একজন কলামিষ্ট লিখেছেন, আমেরিকার বিভিন্ন স্কুলের নোটিশবোর্ডে ভ্যালেন্টাইন’স ডের ইতিহাস লেখা হয়েছে আরেকটু ব্যতিক্রম করে। বিভিন্ন স্কুলে ছোট ছোট বাচ্চারা ভ্যালেন্টাইনসডে পালন করে এবং তাদের স্কুলে এই দিবসের তাৎপর্য লিখে একটি নোটিশ দেয়া হয় ।

এই নোটিশের মধ্যে বলা হয়, ভ্যালেন্টাইন একজন যাজক। তাকে রোমান সরকার গ্রেফতার করে যখন কারাগারে নেয় তখন তাকে বলা হয় যে, রোমান সরকারকে তোমার পূজা করতে হবে । তখন ভ্যালেন্টাইন যিনি খৃষ্টান ধর্মের একজন যাজক, তিনি স্পষ্ট করে বললেন, না আমি রোমান সরকারের কাছে মাথা নত করতে পারিনা, আমি পৌত্তলিকতাকে বিশ্বাস করতে পারিনা। আমি বিশ্বাস করব, যীশু খৃষ্টের পিতাকে, ঈশ্বরকে, তাকেই ভালবাসব, তাকেই বিশ্বাস করব, তারই অনুকরণ করব এবং তারই কথা মত চলব। তারপর তাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়, তখন থেকে এই দিবসকে উদযাপন করা হয়। এই তৎপর্যের কারণে দিবসটির নামকরণ করা হয় ভ্যালেন্টাইন’স ডে।

একজন পাদ্রী তাঁর খৃষ্টীয় ঈমানকে রক্ষা করার জন্য রাজার হাতে নিহত হওয়ার কারণে এই নামে দিবসটিকে স্মরণ করা হয় । তাহলে এখানে আমরা কয়েকটি বিষয় দেখতে পেলাম। প্রথমত: ১৪ই ফেব্রুয়ারীর এই দিবস আজকে নয় বরং খৃষ্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে প্রচলিত এটার প্রচলন করে মূর্তিপূজারীরা। যারা তাদের প্রভুদের সম্মানে এই দিবস পালন করত এবং তারা এদিনে যে অনুষ্ঠান করত তা ছিল অপসংস্কৃতি ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন। এর পর খৃষ্টানরা একটু সংস্কার করার চেষ্টা করে এবং তারা তাদের একজন পাদ্রী এবং যাজক, যাকে প্রেমিকদের যাজক বলা হত, তার নামে এই দিবসের নামকরণ করে ।

দেশে দেশে নিষিদ্ধ করণ :

এ দিবসের কর্মসূচীতে যেহেতু লটারীর বিষয় আছে আর লটারির কারণে অনেক দেশে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। তাই ১৭৭০ সনে ফ্রান্সে এই দিবসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কারণ, লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন হাঙ্গামার সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশগুলোতেও নিষিদ্ধ করা হয়। বৃটেনে শুধু এ দিবস উদযাপিত হত। একজন প্রটেষ্টেন্ট খৃষ্টান তিনি এই দিবসকে বন্ধ করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং বৃটেনেও নিষিদ্ধ করা হয় । তবে ১৭৯০ তে আবার বৃটেনে এই দিবস চালু করা হয় । এই দিবস যখন বৃটেনে চালু হয়, ধীরে ধীরে তা চলে যায় আমেরিকায়। বর্তমানে এই দিবসকে পালনের জন্য সবচেয়ে বড় ইন্ধন দিচ্ছে মার্কিন সমাজ।

ভালবাসা বাণিজ্য :

সর্ব প্রথম ভ্যালেন্টাইন কর্মাশিয়াল কার্ড বের হয় আমেরিকায় ১৮৪০ সনে এবং তা ব্যাপক ভাবে প্রচার করা হয়। প্রথম বছরে কার্ড বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার ডলার । তখন থেকে ইয়াংকি ব্যবসায়ীরা চিন্তা করল এই দিবসকে ব্যাপকভাবে প্রচলন করতে হবে। ব্যবসায়িক চিন্তা ও পুঁজিবাদি মন-মানসিকতার কারণে এই দিবসটিকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। কারণ এই দিবসে কার্ড বিক্রি করা যায়। গোলাপ ফুল বিক্রি করা যায় । বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করা যায়। ব্যবসায়িক একটি মৌসুম করা হয় এই দিবসকে এবং আমেরিকার পুঁজিবাদি সমাজে ব্যাপকভাবে একে ছড়িয়ে দেয়া হয় ।

ভ্যালেন্টাইন’স দিবস পালনের বিধান

এই ইতিহাস জানার পর আমাদের দ্বিতীয় আলোচ্য পয়েন্ট হল, কোন মুসলমান ভ্যালেন্টাইন দিবস পালন করতে পারে কিনা। উত্তরে স্পষ্ট বলতে হয়, না-না- না । কারণ এই দিবসের সাথে কু-সংস্কার জড়িত। এই দিবসের সাথে দেবতার নাম জড়িত, এই দিবসের প্রচলন করে পৌত্তলিকরা, মুশরিক সমাজ । কাজেই যার সাথে ঈমান বিরোধী এতগুলো উপকরণ যুক্ত, এই ধরণের একটি দিবস কি করে মুসলমানরা পালন করতে পারে? মুসলমানরা থার্টিফাস্ট নাইট পালন করতে পারেনা, ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করতে পারে না, বসন্ত বরণ উৎসব পালন করতে পারেনা ।

আবু হুরায়রা (রা.) এর জীবনী

নবীজি স. এর জীবনী

সাহাবীদের জীবনী

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Leave a Comment