শিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান

শিশুর প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা সমাধান : আজকের কিশোর-কিশোরীরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। এডোলেসনস বা বয়ঃসন্ধি সময়ে নারী-পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা তৈরি হয়। কিশোর হয়ে ওঠে পুরুষ আর কিশোরী হয়ে ওঠে নারী। ছেলেদের বয়ঃসন্ধি শুরু হয় ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সে আর মেয়েদের শুরু হয় ৮ থেকে ১৩ বছর বয়সে। আমাদের বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট, জ্ঞান খুবই সীমিত বলে বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যাগুলো আমরা বুঝতে পারি না এবং তাদের সঠিক সমাধানও আমরা করতে পারি না।

আমাদের দেশের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মূলত কিশোরীদেরই প্রজননজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা সবচেয়ে বেশি। এর জন্য দায়ী হলো আমাদের দেশের নিরক্ষরতা, অজ্ঞতা, পুষ্টিহীনতা ইত্যাদি। বয়ঃসন্ধিকালে বা প্রথম ঋতুস্রাবের সময়ে নারীর প্রজনন ক্ষমতা তৈরি হয়। এ সময়ে তার ডিম্বাশয় পরিপক্কতা লাভ করে। পুরো শরীরে ঘটে পরিবর্তনের ঢেউ। কন্ঠস্বরেও পরিবর্তন আসে। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। শরীরে হঠাৎ এই বদলে যাওয়ার ছাপ পড়ে তার মনের মধ্যে। শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে তার মানসিক পরিবর্তন সাধিত হয়। এ ব্যাপারটি তার কাছে নতুন। তাই এ সময়ে মায়ের সাপোর্ট প্রয়োজন হয় । মূলত এ সময়ে পুষ্টির দিকে নজর দিতে হবে বেশি।

সত্যিকার অর্থে জন্মের পর থেকে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে প্রায় নয় বছর বয়স পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রায় একই রকম থাকে। এরপর মেয়েদের শরীরে ডিম্বাশয় থেকে মেয়েলি হরমোনের ক্ষরণ শুরু হয়। এই ডিম্বাশয়কে নিয়ন্ত্রণ করে মস্তিষ্কের এন্টেরিওর পিটুইটারি নামক গ্রন্থি। এই গ্রন্থি থেকে আসে ফলিকল স্টিমুলেটিং হরমোন এবং লিউটিনাইজিং হরমোন। এরা ডিম্বাশয়ের ওপর কাজ করে ছোট ছোট ডিম্বাণুগুলোকে এবং অপরিপক্ক গ্রন্থিগুলোকে পরিপক্ক করে তোলে। বয়ঃসন্ধির পর কোনো মেয়ের শরীরে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হলেই কেবল তার মাসিক ঋতুচক্র শুরু হয়।

এরপর থেকে প্রতি মাসে এটা নিয়মিত ঘটতে থাকে। এ চক্র ২৮ দিন পরপর বা তার সাত দিন আগে-পরে হতে পারে। সব মেয়ের জীবনেই এটা গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে তার শরীর গর্ভধারণের উপযুক্ত হয়ে উঠতে থাকে । তবে বিভিন্ন কারণে মাসিক চক্রের ব্যতিক্রম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ হলো কিশোরী।

আমাদের দেশের কিশোরীরা লজ্জায়, ভয়ে, অজ্ঞতার কারণে তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে পারে না। ফলে তাদের প্রজনন স্বাস্থ্য উপেক্ষিত থেকে যায়। কিশোরীদের বাল্যবিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণের জটিলতা, প্রসবজনিত সমস্যা, অধিক সন্তানের বিপত্তিসহ বিভিন্ন বিষয় বোঝাতে হবে। জন্মনিয়ন্ত্রণ এবং পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান দিতে হবে। এর ফলে কিশোর-কিশোরীরা নতুন পরিস্থিতিতে তাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত শিখতে ও জানতে পারবে। এতে করে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে থাকে। বয়ঃসন্ধিকালে বা প্রথম ঋতুস্রাবের সময়ে যেহেতু মেয়েদের প্রজনন ক্ষমতা তৈরি হয়, তাই মাসিক ঋতুচক্রের তিনটি স্তর তাকে জানতে হবে।

১. মেনোস্ট্রেয়াল পর্যায়

এর স্থিতিকাল পাঁচ-সাত দিন বা তিন-চার দিন। এ সময়ে যোনিপথে রক্ত মিশ্রিত রস ক্ষরণ হয়। রক্তের সঙ্গে জরায়ুর মধ্যকার অস্থায়ী স্তরের খসে পড়া কোষ ও কিছু গ্রন্থির রস মিশ্রণ থাকে।

২. প্রলিফেরাটিভ পর্যায়

এসময়ে জরায়ুর মধ্যে ঝরে যাওয়া কোষ বা কোষের স্তরগুলো মেয়েলি হরমোনের প্রভাব আবার তৈরি হতে শুরু করে।

৩. সিকরেটরি পর্যায়

এসময়ে জরায়ুর মধ্যকার প্রতিটি গ্রন্থি রস নিঃসরণের জন্য তৈরি হয়ে থাকে। পুরুষের শুক্রাণু ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে নিষিত হলে সেটি জরায়ুতে প্রোথিত হয়। শুরু হয় গর্ভধারণ। যদি নির্দিষ্ট মাসিকের মধ্যে গর্ভসঞ্চার না ঘটে, তা হলে পরবর্তী মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হয়। একটি কথা না বললেই নয়, কিশোরীদের প্রজননজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা দূর করতে হলে নারী শিক্ষার হার বাড়াতে হবে। যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করার চেষ্টা করতে হবে। এ ব্যাপারে যেসব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে তা হলো-

  • কিশোর-কিশোরীদের বাবা-মাকে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। কিশোর-কিশোরী এবং বাবা-মাকে এ বিষয়ে জ্ঞানদান করতে হবে। আমাদের দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধি করতে হবে।
  • প্রজনন স্বাস্থ্যকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
  • স্কুলের শিক্ষকদের এবং কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন বিষয়ে জ্ঞানদান করতে হবে। কিশোরীদের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলাভাবে আলোচনার এবং পরীক্ষার জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখতে হবে। চিকিৎসকদের এ ব্যাপারে আরো যত্নবান হতে হবে।
  • বিভিন্ন গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে; যেমন-রেডিও, টেলিভিশন, খবরের কাগজ, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছায়াছবি, নাটক ও ম্যাগাজিন নিয়মিতভাবে প্রজননজনিত সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারে।

এসব সমস্যা এবং তার সমাধানের মাধ্যমেই কেবল আমরা একটি সুন্দর ও সুস্থ জাতির প্রত্যাশা করতে পারি।

মুখের ব্রণ দূর করার উপায়

স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি করার উপায়

যকৃত রোগের চিকিৎসা

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Leave a Comment