হযরত সালেহ (আ) এর জীবনী

হযরত সালেহ (আ) এর জীবনী

বিষয় সংকেতঃ (১) কুরআনে হযরত সালেহ (আ) ও সামূদ জাতির উল্লেখ (২) হযরত সালেহ ও সামূদের বংশ লতিকা (৩) সামূদের বসতি (৪) সামূদের দীন (৫) মুজিযার হাকীকত বা মূলতত্ত্ব (৬) আল্লাহর উট (৭) সামূদের ধ্বংসপ্রাপ্তি ও সালেহ (আ)-এর নতুন রসতি স্থাপন(৮) কিছু শিক্ষণীয় বিষয় (৯) তথ্য কণিকা।

কুরআনে হযরত সালেহ () সামূদ জাতির বর্ণনা

হযরত সালেহ (আ) যে কওমের জন্মগ্রহণ করেন তাকে সামূদ বলা হত। কুরআনের মোট ৯টি সূরায় কওমের বর্ণনা রয়েছে। যেমন আরাফ হূদ, হিজর নামল ফুসসিলাত আননাজম আল কামার, আল হাক কাহ ও আশ শামস।

হযরত সালেহ সামূদের বংশতালিকা

সামূদ কওমের নবী হযরত সালেহ (আ)-এর বংশ-লতিকা সম্পর্কে ঐতিহাসিকরা বিভিন্ন মত পোষণ করেছেন। বিখ্যাত হাফিজে হাদীস ইমাম বাগভী (রঃ))-এর মতে, তাঁর বংশ লতিকা হচ্ছেঃ সালেহ বিন উবায়দ বিন আসফ বিন মাশিহ বিন উবায়দ বিন হাদির বিন সামূদ। আর বিখ্যাত তাবিয়ী হযরত ওহাব বিন মুনাবিবহ-এর মতে তাঁর বংশ লতিকা হচ্ছে, সালেহ বিন উবায়দ বিন জাবির বিন সামূদ।

যদিও বাগভী (রঃ) ওহাবের অনেক পরবর্তী যুগের এবং যদিও তিনি (ওহাব) তাওরাতের একজন আলিম ছিলেন-তবু সালেহ থেকে সামূদ পর্যন্ত বংশ তালিকার মধ্যে বাগভী যে সব অতিরিক্ত কড়া (স্তর)জুড়ে দিয়েছেন, বংশ লতিকা বিশারদদের মতে, ঐতিহাসিক দিক দিয়ে তা মুক্তিযুক্ত ও সমর্থনযোগ্য।

এই বংশ লতিকা দ্বারা এটাও পরিষ্কার বুঝা যায় এই কওম (হযরত সালেহও যার একজন সদস্য ছিলেন) সামূদ বলা হতো এজন্য তাদের শীর্ষ পিতামহের নাম ছিল সামূদ। মোটকথা সামূদ নাম থেকেই সামূদ জাতি বা সামূদ কওমের উদ্ভব হয়েছে।

সামূদ (আ) থেকে নূহ (আ) পর্যন্ত বংশ লতিকাও দু‘ভাবে বর্ণিত হয়েছে। একঃ সামূদ বিন আমির বিন ইরম বিন সাম। দুইঃ সামূদ বিন আদ বিন এ ওস বিন ইরম বিন সাম বিন নূহ (আ)। তাফসরীরে রুহুল মা‘আনী-এর লেখক সাইয়িদ মাহমুদ আলূসী (রঃ) বলেন, ইমাম সা‘লবী (রঃ) দ্বিতীয় মতকেই সঠিক বলে মনে করতেন।

যাহোক উপরোক্ত দুটি মতামত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে সামূদ কওম সামী (সেমেটিক) কওমসমূহেরই একটি শাখা ছিল এবং খুব সম্ভব এরাই সেই সব ব্যক্তি যারা আদে উলার ধ্বংসপ্রাপ্তির সময় হযরত হূদের সাথে নাজাত পেয়েছিল এবং পরবর্তীকালে আদে সানিয়া জনগোষ্ঠীর নামে পরিচিত হয়েছে। আর নিঃসন্দেহে এরা আরবে বাণিয়দারই (ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব বংশ) শামিল।

সামূদের বসতি

সামূদ জাতির বসতি কোন অন্চলে বা কোন ভূখন্ডে বিস্তৃত ছিল? এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই তাদের বসতি ছিল হিজরে। হিজায ও সিরিয়ার সধ্যবর্তী ওয়াদিয়ে কুরা পর্যন্ত যে প্রান্তর দৃষ্টি প্রড় তার সর্বত্রই এরা বসবাস করত। আজকাল এই ভূখগু ফাজ্জুন নাকা নামে পরিচিত। সামূদ কওমের বসতিসমূহের ধ্বংসাবশেষ এখনো বিদ্যমান এবং এ যুগেও মিসরের কিছুসংখ্যক বিশেষজ্ঞ নিজ চোখে এসব প্রত্যক্ষ করেছেন। তাদের নিরীক্ষা-প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারা এমন একটি ভবনে প্রবেশ করেছেন যাকে শাহী ভবন বলা হত। তাতে অনেক ক্ক্ষ রয়েছে এবং ভবনের সাথে একটি বিরাট ঝর্ণাও বিদ্যমান। আর এই সম্পূর্ণ ভবনটিই পাথরের পাহাড় কেটে নির্মাণ করা হয়েছে। কিখ্যাত আরব ঐতিহাসিক মাসউদী লিখেছেন,সিরিয়া থেকে হিজাব আগমনকারী মহাসড়কে ওদের মুছে যাওয়া চিহ্নাদি ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার দৃষ্টি পড়ে।

হিজরের এই জায়গা, যাকে হিজরে সামূদ বলা হয়, শাহরাইন থেকে দক্ষিণপূর্ণ দিকে এমনভাবে অবস্থিত ঠিক তার সামনে পড়ে আকাবা উপসাগর এবং আদকে যেমন আদের ইরম বলা হয়, ঠিক তেমনি এদেরকেও তাদের ধ্বংসপ্রাপ্তির পর সামূদে ইরম কিংবা আদে সানিয়া বলা হয়ে থাকে।

প্রাচ্যের দেশসমূহ, বিশেষ করে আরব সম্পর্কে ইউরোপের প্রাচ্যবিদরা১ যেমন তাদের অতুলনীয় পান্ডিত্যের পরিচয় দিয়েছেন এবং ঐতিহ্যসিক গবেষণার নামে নানা রকমের ভ্রান্ত দাবি উত্থাপন করেছেন তেমনি তারা সামূদকেও তাদের গবেষণা-চর্চার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছেন। তারা প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, সামূদের উৎস কি? তাদের আবির্ভাব কখন এবং কোন যুগে ? এ প্রশ্নের উত্তরে তারাই আবার দু‘দলে বিভক্ত হয়েছেন। এক দলের মতে, এরা ইহুদীদেরই একটি কওম, যারা ফিলিস্তিনে প্রবেশ না করে এখানেই বসতি স্থাপন করেছিল কিন্তু একথা শুধু ভ্রান্ত নরূ বরং একেবারে অর্থহীন ও গবেষণা-বহির্ভূত।

কেননা ঐতিহ্যসিকদের সর্ববাদীসম্মত মতামত এই যখন সামূদ কওম এবং তাদের বসতিসমূহ ছিন্ন ভিন্ন ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তার অনেক অনেক যুগ পরে হযরত মূসা বনী ইসরাইলদের নিয়ে মিসর থেকে বের হন। পবিত্র কুরআনেও পরিষ্কার বলা হয়েছে যখন ফিরাউনের কওম মূসা (আ)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে তখন ফিরাউন বংশেরই একজন মুমিন ব্যক্তি এই বলে তার কওমকে ভয় প্রদর্শন করেছিল তোমাদের এই মিথ্যা আরোপের পরিণাম সম্ভবত তাই হবে যা আপন আপন নবীদের প্রতি মিথ্যা আরোপের কারণে তোমাদের পূর্ববর্তী নূহ, আদ সামূদ কওম এবং তাদের পরবর্তী বিভিন্ন কওমের ক্ষেত্রে হয়েছি।

প্রাচ্যবিদদের অপর দলের দলের মতে, সামূদ জাতি আমালিকা দেরই একটি শাখা। এরা ফুরাত নদীর পশ্চিম তীর থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। এদর কারো কারো মতে, এরা হলো আমালিকদের সেই মানবগোষ্ঠী।

(১) ইউরোপের যে সব শিক্ষাবিদ প্রাচ্যের ইতিহাস এবং বিভিন্ন জ্ঞান বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা ও চিন্তা-গবেষণা করেন তাদেরকে প্রাচ্যবিদ বলা হয়। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত সূক্ষ্ম জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন বটে, তবে তাদের অধিকাংশ এক্ষেত্রে একেবারে অনুমান ভিত্তিক ও মনগড়া কথা বলে হয় প্রাচ্যের প্রতি নিজেদের শত্রুতার পরিচয় দিয়েছেন, নয়ত পরিচয় দিয়েছেন নিজেদের অমূলক ভাসা ভাসা জ্ঞানের।

যাদেরকে মিসর-সম্রাট আহমাস দেশ থেকে বহিষ্কার করে দিয়েছিলেন। আর যেহেতু এরা মিসরে থাকাকালীন সময়ে পাথর-খোদাই শিল্পে চমৎকার দক্ষতা লাভ করেছিল তাই হিজরে গিয়ে তারা পাহাড় এবং পাথরসমূহ খোদাই করে অত্যন্ত সুন্দর সুন্দর ইমারত ও সুউচ্চ রাজসিক প্রাসাদ নির্মাণ করে। কিন্তু আমরা আদ-এর বর্ণনায় একথা প্রমাণ করে এসেছি আদ ও সামূদ ছিল সৌমটিক জাতিসমূহেরই অন্তর্ভূক্ত। আরবরা শুধু ইহুদীদের অন্ধ অনুকরণে এদেরকে আমালিকাদের অন্তর্ভূক্ত বলে ধারণা করে। প্রকৃতপক্ষে এই বংশের সাথে আমলীক বিন উদ-এর কোনই সম্পর্ক নেই। অতএব উপরোক্ত মতামত ঠিক নয়।

উপরোক্ত মতামতসমূহের বিপরীত মুহাক্কিকদের (বিশেষজ্ঞদের) মতামত হলো, এরা আদ কওমেরই অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী। আর এ মতামতই সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য। আর হাদরামাউতবাসীদের দাবী-সামূদদের বসতি এবং ইমারতসমূহ আদদের কারিগরিরই ফলশ্রুতি একথার বিরোধিতা করে না যে, সামূদরা নির্মাণ-শিল্পে চমৎকার দক্ষতার অধিকারী ছিল এবং এ ইমারত তাদের দ্বারাই নির্মিত হয়েছিল। কেননা আদে উলা, আর আদে সানিয়া আর কিছু হোক, আদ তো বটে। হযরত সালেহ স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে যা বলেছিলেন তাও উপরোক্ত মতামতেরই প্রতিধ্বন। যেমন স্মরণ কর, আদ কওরেম পর তিনি তোমাদেরকে তাদের স্থলাভিত্তিক করেছেন; তিনি তোমাদেরকে পৃথিবীতে এমনভাবে সুপ্রতিষ্ঠত করেছেন তোমরা সমতল ভূমিতে প্রাসাদ ও পাহাড় কেটে বাসগৃহ নির্মাণ করছ।(সূরাঃ আল-আরাফ, আয়াতঃ৭৪)

এবার থাকলো সামূদ জাতির সময়কালের ব্যাপারটি। এ সম্পর্কে সঠিকভাবে কোন চূড়ান্ত মতামত প্রদান করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কেননা ইতিহাস এ ব্যাপারে স্থির-নিশ্চিত নয়। তবে এটা নিশ্চয় করে বলা যেতে পারে সামূদরা ছিল হযরত ইবরাহীম (আ)-এর পূর্ববর্তী যুরেগ মানব এবং এই মহাসম্মানিত নবীর আবির্ভাবের অনেক পূর্বেই তারা পৃথিবী থেকে ধ্বংস হয়ে যায়। এখানে একটি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য সামূদের বসতির আশে-পাশেই এমন কিছু সমাধিসৌধের সন্ধান পাওয়া গেছে যাতে আরামী ভাষায় উৎকীর্ণ কিছু কিছু তথ্যাদি রয়েছে। তাতে যে সন-তারিখের বর্ণনা করা হয়েছে তা হযরত ঈসা (আ)- এর কিন্চিৎ পূর্বেকার। এ থেকে এ ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয় এই কওম হযরত মূসার পরবর্তী যুগের কিন্তু মূল ব্যাপার তা নয়।

বস্তুথ ঐ সব সৌধ হচ্ছে েএমন একটি মানবগোষ্ঠীর, যারা সামূদ বংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার হাজার হাজার বছর পর এখানে এসে বসতি স্থাপন করছিল। ওরাই তাদের পূর্বপুরুষদের প্রাচীনত্বের নিদর্শন জাহির করার জন্য আরামী হস্তাক্ষরে (যা অতিপ্রাচীন হস্তাক্ষর বলে স্বীকৃত) কিছু কিছু তথ্য স্মৃতিসৌধের গায়ে উৎকীর্ণ করে দিয়েছিল যাতে তা স্মরণীয় হয়ে থাকে। অন্যথায় ঐ সব সমাধিসৌধ না সামূদ জাতির, আর না তাদের যুগে নির্মিত।

মিসরের বিখ্যাত খ্রীষ্টান ঐতিহসাকি জুর্জী যায়দান তার আল আরব কাবলাল ইসলাম শীর্ষক গ্রন্থে উপরোক্ত অনুমানভিত্তিক কথার কাছাকাছি বক্তব্য রেখেছেন। যেমনঃ ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং তাতে উৎকীর্ণ তধ্যাদি থেকে যা প্রতিভাত হয় তা হলো, সালেহ (আ)-এর কওরেম বসতিসমূহ খ্রীষ্টজন্মের কিন্চিৎ পূর্বে নাবতীদের দখলে চলে যায়। এরা ছিল বাত্মরাহ-এর অধিবাসী। এদের নিদর্শনাদি এবং টিলাসমূহ অনেক প্রাচ্যবিদ স্বচক্ষে দেখেছেন, যার বর্ণনা আমি এ গ্রন্থের ভূমিকায় বিশদভাবে করেছি। পাথরের উপর উৎকীর্ণ এদের সম্পর্কে যে সব তথ্যাদি রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে, গুরুত্বপূর্ণ হলো কাসরে বিনত কবর বা-শা কিলআ এবং বুরজ নামক ধ্বংসাবশেষে প্রাপ্ত তথ্যাদি, যার অধিকাংশ বরং সবটাই সমাধিসৌধের গায়ে উৎকীর্ণ।

প্রাচ্যবিদরা এখান থেকে যেসব নমুনাদি উদ্ধার করেছেন তার মধ্যে নিম্নলিখিত লেখাটি ও রয়েছে যা পাথরের উপর নাবতী হরফসমূহে উৎকীর্ণ এবং যা খ্রীষ্টজন্মের কিন্চিৎ পূর্বেকার। উৎকীর্ণ লেখার বিষয়বস্তু হচ্ছে নিম্নরূপঃ

এ সমাধিসৌধটি কুমকুম বিনতে ওয়ায়লী বিনতে হারাম এবং কুমকুমের কন্যা কুলায়বা তাদের জন্য এবং তাদের বংশধরদের জন্য তৈরি করেছে। এর তৈরি কাজ আরম্ভ করা হয় খুব ভাল মাসে (অর্থাৎ যে মাসে মুলগ্ন রয়েছে)। এখন নাবতীদের বাদশাহ হারিসের সিংহাসন আরোহণের নবম বর্ষ যিনি ছিলেন তার মওমের সত্যিকার প্রেমিক (দরদী)। অতএব আমী যুশশারী ও আরশাহ= ১ লাত, আমন্দ, মানাত এবং কায়সের অভিশাপ বর্ধিত হোক তাদের উপর যারা এই সমাধিগুলোকে বিক্রি করবে কিংবা রেহেন (বন্ধক) রাখবে কিংবা এসব থেকে কোন দেহ বা দেহাংশ বের করবে কিংবা এখানে কুমকুম তার কন্যা এবং তাদের বংশধর ছাড়া অন্য কাউকে সমাহিত করবে।

এবং যে ব্যক্তি সমাধিসৌধের উপর লিখিত নির্দেশাদির বিরোধিতা করবে তার উপর যুশশারী, হুবল ও মানুতের পন্চ অভিশাপ বর্ষিত হবে িএবং যে সাহিব (পুরোহিত)- এর বিপরীত কর্ম করব তার উপর এক হাজার হারিসী ‍দিরহাম জরিমানা স্বরূপ সাব্যস্ত হবে-কিন্তু যদি তার হাতে কুমকুম, কুলায়বা কিংবা তার বংশধরদের কারো হস্তলিখিত এমন অনুমনি পত্র থাকে যাতে স্পষ্ট ভাষায় অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং সে অনমতি পত্র যে বিশুদ্ধ হয়, বানাওট (কৃত্রিম) না হয়। এই সমাধিটি ওহাব আললাত বিন উবাদা নির্মাণ করেছেন।

সামূদের দীন

পৌত্তলিক পূর্বপুরুষদের ন্যায় সামূদরাও ছিল পৌত্তলিক। তার এক আল্লাহর স্থলে বহু সংখ্যক বাতিল দেবতার পূজা-আরাধনা করত। তাদের সংস্কার ও পথ প্রদর্শনের জন্য তাদেরই কওমের মধ্য থেকে হযরত সালেহ (আ)-কে নবী করে প্রেরণ করা হয়, যাতে তিনি তাদেরকে সুপথে নিয়ে আসেন, আল্লাহর ঐ সব নিয়ামত (অনুগ্রহ) স্মরণ করিয়ে দেন যা তারা রাতদিন (সর্বক্ষণ) উপভোগ করছে, স্পষ্টভাবে তাদেরকে বুঝিয়ে দেন যে, সৃষ্টির প্রতিটি বস্তু আল্লাহর তাওহীদ ও একত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে এবং নিশ্চিত দলীল-প্রমাণের সাহায্যে তাদের পথভ্রষ্টতার মূল রহস্য প্রকাশ করে দেন, আর তাদেরকে বলে দেন েএক আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ইবাদত উপাসনা পাওয়ার যোগ্য নয়।

পবিত্র কুরআনে কাহিনী বর্ণনার উদ্দেশ্য

পবিত্র কুরআনের রীতি এ তা মানবের পথ প্রদর্শনের জন্য অতীত কওমসমূহ এবং তাদের পথ-প্রদর্শকদের ঘটনা ও অবস্থাদি বর্ণনা করে, যাতে তারা এথেকে উপদেশ ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এর উদ্দেশ্য স্রেফ কাহিনী বর্ণনা নয় বরং এটা বলে দেয়া আল্লাহ তা‘আলা যখন মানবকে বুদ্ধি ও বিবেকসদৃশ আলো দান করেন তখন তাদের হিদায়েত ও নাজাতের জন্যও এমন কিছু কিছু উপাদান ও আসবাব-সামগ্রী দান করেন, বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে যার মাধ্যমে তারা নিজেদের কাজ সম্পাদন করতে পারে এবং আল্লাহ কিসে সন্তুষ্ট আর কিসে অসন্তুষ্ট তাও অবগত পারে। কুরআন বলে দিয়েছে, আল্লাহ তাআলার একটাই চিরান্তন নিয়ম।(=) তিনি মানবের হিদায়তের জন্য তাদেরই মধ্য থেকে নবী-রসূল মনোনীত করে থাকেন।

তাই নবী স্বীয় কওমকে ন্যায় ও সত্যের পথ দেখান এবং সর্বপ্রকার পথভ্রষ্টতা ও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার প্রতি তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেন। একাজ করতে গিয়ে তারা বাস্তব উদাহরণ হিসাবে অতীত কওমসমূহের ঘটনাদি বর্ণনা করেন, অতীত ইতিহাসের পুনরাল্লেখ করেন-যাতে মানব বুঝতে পারে অতীতের যে সব কওম নিজেদের রসূলের হিদায়েত অনুসরণ করেছিল তারা দুনিয়া আখিরাতে শান্তি ও সৌভাগ্য লাভ করেছে এবং যারা নবী রসূলের কথা অস্বীকার করেছিল, তাদের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল এবং তাদের নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেছিল, আল্লাহ তা‘আলা সে নবী রসূলদের সত্যতা প্রমাণের জন্য কখনো নিজে থেকে, আবার কখনো মানবের দাবির প্রেক্ষিতে এমন কিছু নিদর্শন প্রদান করেন যা নবী রসূলদের সত্যতার কারণে পরিণত হয়। ঐ সব নিদর্শনই মুজিযা নামে খ্যাত।

এই মুজিযা প্রাপ্তির পরও সে কওম স্বীয় নবীর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা থেকে বিরত হয় নি, বরং বিদ্বেষ ও শত্রুতাবশত সত্য অস্বীকারের উপর অনড় থেকেছে আল্লাহর আযাব তাদেরকে অত্যন্ত নিমর্মভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আগত কওমসমূহের জন্য শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে তাদের ঘটনাসমূহ। তোমার প্রভু জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, তার কেন্দ্রে স্বীয় আয়াত তেলাওয়াত করার জন্য রসূল প্রেরণ না করে এবং তিনি জনপদসূহকে তখনই ধ্বংস করেন যখন তার অধিবাসিরা সীমালংঘন করে । (সূরাঃআল-ক্বাসাস, আয়াতঃ৫৯)

মুজিযার হাকীকত বা তাৎার্য

যে বস্তু অন্যকে নিরস্ত, ক্ষান্ত বা পরাজিত করে-আভিধানিক অর্থে তাকে মুজিযা বলা হয়। আর ইসলামের প্রচলিত অর্থে এমন কর্মকে মুজিযা বলা হয় যা স্বাভাবিক কার্যকারণ ছাড়াউ অস্তিত্বে রূপান্তরিত হয়। সাধারণভাবে একে খালকে আদত (স্বভাব বিরুদ্ধ কর্ম) বলা হয়। এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে আদতুল্লাহ (আল্লাহর নির্ধারিত পদ্ধতি)-এর বিপরীত ঘটা কি সম্ভব? অপর কথায় বলা যেতে পারে,তবে কানুনে কুদরত (আল্লাহর বিধান)-এর পরিবর্তন কি সম্ভব? উত্তর এ খালিকে আদত বস্তুর উপর মুজিযা শব্দের প্রয়োগ ঠিক নয়। কেননা আল্লাহ তাআলার কানুনে ফিতরাত (প্রকৃতির বিধান) দুভাগে বিভক্ত। যেমন(১) সাধারণ প্রকৃতি ও কার্যকারণের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত।

যেমন আগুন পোড়ায় ও পানি ঠান্ডা করে। আর বিশেষ প্রকৃতি দ্বারা ঐ সব বস্তুর অস্তিত্ব অর্জনকে বুঝায় যেসবে আল্লাহ তাআলা বিশেষ কোন উদ্দেশ্যে কার্য ও কারণের মধ্যে সংযোগ রাখেন নি বা করণ ছাড়াই যেসবকে অস্তিত্ব দান করেছেন। যেমন কোন দেহের আগুনে পুড়ে যাওয়ার সমূহ কারণ থাকা সত্ত্বেও না পোড়া কিংবা দু‘তিন জন মানবের খোরাক দ্বারা শ‘দুশ মানুষের পেট পুরে খাওয়া এবং (তা সত্ত্বেও) মূল খোরাক যেমনটি ছিল ফিক তেমনটিই থেকে যাওয়া।

উপরোক্ত দুটি ঘটনা সাধারণ চোখে প্রকৃতির বিধানের বরখেলাফ বিধায় যখন এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটে কিংবা ঘটবে বলে ঘোষণা দেয়া হয় তখন বলা হয়ে থাকে এটা আদতুল্লাহ প্রকৃতির বিধানের বরখেলাফ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা সাধারণ প্রকৃতির বরখেলাফ হলেও বিশেষ প্রকৃতির বরখেলাফ নয়। আর বিশেষ প্রকৃতি তো কানুনে কুদরতেরই (আল্লাহর নির্ধারিত প্রকৃতির পদ্ধতিরই) এমন একটি বিশেষ স্তর বা অবস্থা যা বিশেষ কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। আর সে বিশেষ উদ্দেশ্যটি হলো, আল্লাহ কর্তৃক তাঁর রসূলের সত্যতা প্রমাণ করা এবং রসূলের প্রতি মিথ্যা আরোপকারীদের চোখে আংগুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া রিসালতের এই দাবিদার যদি তার দাবিতে সত্য বা হত তবে সে কখনো আল্লাহর এ সাহায্য-মদদ পেত না। অতএব সাধারণ কানূনে কুদরতের বরখেলাফ নবীর এই কর্ম প্রমাণ করে এটা মূলত নবীর কর্ম নয় বরং আল্লাহরই কর্ম, যা বিশেষ অবস্থাধীন নবীর সত্যতার একটি বিশেষ প্রমাণ হিসাবে পরিগণিত হয়।

এতে সন্দেহ নেই যদি কোন নবীকে মুজিযা নাও দেয়া হত তবু নবুওত-জীবন, হিদায়েত কিতাব এবং বুদ্ধি-বিবেক-সম্মত প্রামাণ ও প্রমাণাদির আলোকে তার সাদাকত বা সত্যতার উপর ঈমান স্থাপন করা অবশ্য প্রয়োজনীয় হত এবং তাকে অস্বীকার করা দীনের পরিভাষায় কুফর ও অবাধ্যতা বলে পরিগণিত হত। এতদসত্ত্বেও এটা একটা হাকীকত (প্রকৃত ব্যাপার) যে, সূযালোকর চেয়েও উজ্জ্বল প্রোজ্জ্বল বিবেক-প্রসূত ও শ্রুতিনির্ভর দলীল প্রমাণের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানবের মন-মেযাজ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সত্যকে গ্রহণ করার জন্য এমন সব বস্তু দ্বারা অধিকতর প্রভাবিত হয় যেসব বস্তু মানুষের বুদ্ধিকে পরাভুত এবং মস্তিস্ককে মন্ত্রমুগ্ধ করে তাদের কাছে প্রকাশ করে দেয় নবুওতের দাবীর সাথে নবীর এই কর্ম নিঃসন্দেহে আল্লাহ প্রদত্ত এমন একটি শক্তি, যার মুকাবিলা করা মানবের সাধ্যের বাইরে। নবীর ঐ কর্মের সামনে পরাজিত ও পরাভূত হয়ে তারা বিশ্বাস করতে বাধ্য হয় নিশ্চয় এই ব্যক্তি আল্লাহর সাহায্য-মদদ ও বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত এবং সে যা কিছু বলে আল্লাহর পক্ষ থেকেই বলে।

অতএব এ পর্যায়ে পৌছে বৃদ্ধি-নির্ভর পন্ডিতদের একথা বলা মুজিযা নবুওতের প্রমাণ নয় একেবারে ঢাহা মিথ্যা বক্তব্য এবং আল্লাহর সত্যতার প্রতি এমন মিথ্যা আরোপ, যাকে অপর কিছু বলা যেতে পারে তবে ঈমানের নিদর্শন মোটেই বলা যেতে পারে না।

মোদ্দাকথা, যে পর্যন্ত নবী ও রসূলগণ মুজিযা না দেখাবেন সে পর্যন্ত এর উপর তাদের নবী হওয়ার সত্যতা নির্ভর করবে না।কিন্তু অস্বীকারকারীদের দাবির প্রেক্ষিতে কিংবা নিজ থেকে যদি নবী কোন মুজিযা প্রদর্শন করেন তবে নিশ্চিতভাবে সে মুজিযা নবুওতের প্রমাণ হিসাবে গণ্য হবে। তখন এই মুজিযার সত্যতাকে অস্বীকার করা, কুফর ও অবাধ্যতারই নামান্তর।           

অতএব বিশিষ্ট-অবিশিষ্ট নির্বিশেষে সবার জন্যই একান্ত প্রয়োজন নবী-রসূলগণ নিশ্চিতভাবে যেষব মুজিযা নিয়ে এসেছেন এর উপর ঈমান স্থাপন করা এবং সেসবের অস্তিত্ব ও মাহাত্ম্যকে স্বীকার করে নেয়া। কেননা এসবের কোন একটিকেও অস্বীকার করা ইসলামকেই অস্বীকার করার অন্তর্ভূক্ত।

অবশ্য এ বক্তব্য ভুলে গেলে চলবে না কোন ব্যক্তি থেকে শুধু ও শ্রেণী খালিকে আদত (স্বভাব-বিরোধী) কর্ম প্রকাশিত হওয়ার নাম মুজিযা নয়। আর ‍শুধু এ রকমের কর্ম প্রদর্শন করলেই কেউ নবী হয়ে যান না। কেননা নবী ও রসূল হওয়ার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন হলো, তার সমগ্র জীবন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিতর দিয়ে উত্তীর্ণ হবে অথচ তাঁর মধ্যে অশালীন বা আপত্তিকর কিছু পাওয়া যাবে না, বরং পাওয়ার যাবে উন্নত চরিত্র, নিষ্কলুষ স্বভাব, সত্যবাদিতা ও সৎকর্মের সফল বাস্তবায়ন ও সর্বোৎকৃষ্ট নমুনা। অতএব এ রকমের কোন ব্যক্তি যদি নবুওতের দাবি করেন এবং স্বীয় দাবির সত্যতার বিভিন্ন দলীল-প্রমাণ উপস্থাপনের পরও আল্লাহর নিদর্শনসমূহ (মুজিযাসমূহ) উপস্থাপন করেন তবে তিনি নিঃসন্দেহে নবী এবং তার  প্রদর্শিত নিদর্শন সমূহ নিশ্চিতভাবে মুজিযা।

আমরা ইতিপূর্বে বলেছি মুজিযা প্রকৃতিপক্ষে নবীর নিজের কর্ম নয় বরং তা আল্লাহরই কর্ম যা নবীর হাত দিয়ে জাহির হয় এবং তাকে মুজিযা বলা হয়। এটা এজন্য নবীও একজন মানব এবং আল্লাহর সাধারণ ও বিশেষ প্রকৃতি-নীতির মধ্যে হস্তক্ষেপ তথা পবিবর্তন-পরিবর্ধন মানবের সাধ্যাতীত ব্যাপার।

এটা একমাত্র আল্লাহর ইচ্ছাধীন তিনি মুহূর্তে ও বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নবী রসূলদের হাত দিয়ে এমন সব ক্রিয়াকর্ম জাহির করেন যা তাঁর বিশেষ প্রকৃতি-নীতির অন্থর্ভুক্ত। তিনি যদি না চান তবে নবী-রসূলের পক্ষে নিজে থেকে ঐ সব ক্রিয়াকর্ম জাহির করা একেবারেই অসম্ভব।

বদরযুদ্ধে যখন তিনি শ‘তের জন মুসলিমের উপর উৎকৃষ্ট সমরাস্ত্রে সজ্জিত এক হাজার দুশমন হুংকার দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন রসূলুল্লাহ (সঃ) তাদের দিকে এক মুষ্ঠি মৃত্তিকা ছুঁড়ে মেরেছিলেন, যার কারণে প্রতিটি দুশমন সৈন্যের চোখে এমনভাবে ধূলিকণা ঢুকে গিয়েছিল তারা একেবারে অস্থির হয়ে নিজেদের চোখ শুধু ডলাই-মলাই করছিলো। আর এভাবেই তারা শোচনীয় পরাজয় বরণ করেছিল হাতে গোনা এবং বলতে গেলে নিরস্ত্র কয়েকজন মুসলিমের হাতে। এ ঘটনাটি অতি সংক্ষেপে অথচ আকর্ষনীয় ভংগিতে পবিত্র কুরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তাতে আমাদের উপরোক্ত দাবির যথার্থতা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়,এবং তুমি যখন নিক্ষেপ করেছিলে তখন তুমি নিক্ষেপ করনি (বরং) আল্লাহিই নিক্ষেপ করেছিলেন। (সূরাঃ আনফাল, আয়াতঃ১৭)

এবার খেয়াল করুন, যেক্ষেত্রে নবীর হাত দিয়েই একটি কর্ম সম্পাদিত হল, সেটাকে সরাসরি মুজিযা বলেই আখ্যায়িত করা হলো। বলা হলো, হে নবী, এক মুষ্টি মৃত্তিকা তোমার দ্বারাই নিক্ষিপ্ত হলো; কেননা তা তোমারই হাতে ছিল। তবে মুষ্টিভর মৃত্তিকা এ প্রভাব দুশমনরা অনেক ব্যবধানে থাকা সত্ত্বেও এবং সংখ্যায় অনেক হওয়া সত্ত্বেও তাদের সকলেরই চোখে তা থেকে ধূলিকণা ঢুকিয়ে দেয়া তোমার প্ক্ষে ছিল অসম্ভব। প্রকৃতিপক্ষে এটা ছিল আল্লাহরই কুদরতীখেলা তিনি এক পলকে সব অসম্ভবকে সম্ভব করে এক মুষ্টি মৃত্তিকা মধ্যে এমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছেন যার কারণে গোটা দুশমনসৈ্যি পিঠটান দিতে বাধ্য হয়েছে। েএটা সেই হাকীকত (তত্ত্বকথা) যা বর্ণিত হয়েছে অতি স্পষ্ট ভাষায় পবিত্র কুরআনে অর্থাৎ মুজিযা নবীর নিজের কর্ম নয়, বরং তা সরাসরি আল্লাহর কর্ম যা নবীর হাত দিয়ে-তাঁরই সাহায্যর্থে আল্লাহ তাআলা জাহির করে থাকেন। আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করা কোন রসূলের কাজ নয়। আল্লাহর নির্দেশ আসলে মীমাংসা হয়ে যাবে এবং তখন মিথ্যাবাদীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (সূরাঃআল-মু‘মিন, আয়াতঃ৭৮)

তারা আল্লাহর নামে কঠিন কসম করে বলে, তাদের কাছে যদি কোন নির্দেশ আসত তবে অবশ্যই তারা তাতে ঈমান আনত; বল নিদর্শন তো আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত, তাদের কাছে নিদর্শন এলেও তারা ঈমান আনবেনা এটা আমি তোমাদের বোধগম্য করাই কিভাবে? (সূরাঃআল-আনয়াম, আয়াতঃ১০৯)

মুজিযা সম্পর্কিত আমাদের এ আলোচনা ঐ ব্যক্তির জন্য নিশ্চয়ই সান্ত্বনার কারণ হবে, যে দীনের এই মৌলিক আকিদায় বিশ্বাসী সৃষ্টির প্রত্যেকটি বস্তুর বৈশিষ্ট্য তার সত্তাগত বৈশিষ্ট্য নয় বরং তা তার প্রতি স্রষ্টার বিশেষ অবদান মাত্র। এই আকিদার বিশ্বাসী ব্যক্তি অতি সহজেই বুঝতে পারে আগুনের মধ্যে জ্বলনের বৈশিষ্ট্য সৃষ্টিকারী তার জন্য এই সাধারণ প্রাকৃতির আইন বেধে দিয়েছেন যে কেউ তাকে স্পর্শ করবে সে-ই পুড়বে, কিন্তু বুদ্ধিগত দিক দিয়ে এটাও অসম্ভব নয় সে (সৃষ্টকারী) কোন বিশেষ উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আগুনের এই বৈশিষ্ট্যকে কোন একটি বিশেষ অবস্থায় একেবারে নিস্ক্রিয় করে দেবেন এবং তা কানূনে কুদরতের বিশেষ প্রকৃতি হিসাবে বিবেচিত হবে।

কিন্তু যে ব্যক্তি দীনের এই মৌলিক আকিদায় বিশ্বাসী নয় এবং প্রত্যেক বস্তুর বৈশিষ্ট্যকে তার সত্তাগত বৈশিষ্ট্য বলে মনে করে এবং ‍এও ধারণা করে যে কোন মুহূর্তে এ বৈশিষ্ট্য ঐ বস্তু থেকে পৃথক হওয়াটা অসম্ভব- সে ব্যক্তির সাথে সর্বপ্রথম একটি প্রশ্নের মীমাংসায় আসতে হবে। আর তা হলো বুদ্ধি কি একে সমর্থন করে নিজের অস্তিত্বের ব্যাপারেই যে বস্তু পরমুখাপেক্ষী তার কোন বৈশিষ্ট্য সত্তাগতভাবে চির বিদ্যমান থাকতে পারে? গত বছর লন্ডন ও আমেরিকায় খুদাবখশ কাশ্মিরী জ্বলন্ত আগুনের উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার যে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল তাতে দেখা যায়, সে নিজেও আগুনের উপর দিয়ে হাঁটছে এবং অপর ব্যক্তিকেও তার সাথে আগুনের উপর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

ঘটনা প্রত্যক্ষ করার সাথে সাথে উপস্থিত বিজ্ঞানীরা খুদা বখশের দেহকে বিভিন্নভাবে পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে চেয়েছেন, সেটা ফায়ার গ্রুফ কিনা, কিন্তু কিছুই জানতে বা বুঝতে পারেননি, বরং তাদের স্বীকার করতে হয়েছে তার দেহ এবং আগুনের উপর দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচলকারী অপরাপর ব্যক্তির দেহ সাধারণ ব্যক্তির দেহের চেয়ে কোন বিশেষ বৈশিষ্ঠ্যর অধিকারী নয়; এমনকি শেষ পর্যন্ত তারা যারপর নেই বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে স্বীকার করেছেন যে তারা এই রহস্য অনধাবন করতে অক্ষম যে, আগুন ঠিক আছে, কিন্তু জ্বালাচ্ছে না? –এর কি উত্তর আছে তাদের কাছে যারা প্রত্যেক বস্তুর বৈশিষ্ট্যকে তার সত্তাগত ও চির বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য বলে ধারণা করেন ?

ইলমে এত চর্চা থাকা সত্ত্বেও যখন আমাদের অসহায়ত্বের এ অবস্থা তখন আমাদের পক্ষে কি এটা সাজে ইলমে য়াকীন (আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান-অহী) –এর বর্ণিত হাকীকত (মুজিযা) আমরা এজন্য অস্বীকার করবো আমাদের বুদ্ধি সাধারণ অবস্থায় কারণ ছাড়া কোন কর্ম দেখতে অভ্যস্ত নয়? মোটকথা, এমন মানবে উচিত, প্রথমে আল্লাহ এবং তাঁর গুণাবলি-বিশেষ করে শক্তি গুণ সম্পর্কে আলোচনা-পর্যালোচনা করা, অতপর মনোনিবেশ করা চলতি বিষয়ের আলোচনা পর্যালোচনায়। কিন্তু এসব আলোচনা-পর্যালোচনার মূল স্থান এখানে নয়, বরং ইলমে কালামে তথা তর্কশাস্ত্রে।

আল্লাহর উট

মোটকথা, হযরত সালেহ (আ.) কওমকে (সামূদকে) বার বার বুঝালেন, উপদেশ দিলেন, কিন্তু তাদের উপর এর কোনই আসর (প্রভাব) হল না। বরং তাদের বিদ্বেষ ও দুশমনী আরো বৃদ্ধি পেল। তারা আরো শক্তভাবে তার বিরোধিতা করতে লাগলো এবং মূতিপূর্জা থেকে মোটেই বিরত হলো না। যদিও একটি অতি ক্ষুদ্র দল আল্লাহর একত্বের ঈমান স্থাপন করলো, কিন্তু কওমের নেতারা, বড় বড় পুঁজিপতিরা আল্লাহর অবাধ্যই রয়ে গেল। তারা আল্লাহ-প্রদত্ত আরাম-আয়েশ ও সুযোগ-সুবিধার জন্য কৃতজ্ঞতা জাহির না করে এবং আল্লাহর প্রতি কৃতঘ্ন থাকাকেই নিজেদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত করলো।

তারা ঠাট্টা বিদ্রুপ করে হযরত সালেহকে বলত, সালেহ, আমরা যদি বাতিলের পূজারী হতাম,যদি তার সত্য ধর্মের বিরোধী হতাম, তার পছন্দনীয় জীবন ব্যবস্থার উপর অটল না থাকতাম তবে আমরা এই ধন-দওলত, ফলে-ফুলে ভর্তি সবুজ-শ্যামল উদ্যানরাজি সোনা-রুপার প্রাচুর্য, সুউচ্চ উদ্যানরাজি, মিষ্টি পানির স্রেতস্বিনী নদী-নালা, চোখ জুড়ানো ঢেউ খেলানো ফসলের মাঠ, বনরাজি ইত্যাদির অধিকারী হতাম না। তুমি তোমার নিজের দিকে এবং তোমার অনুসারীদের দিকে লক্ষ্য কর, প্রত্যক্ষ কর তোমাদের অসচ্ছলতা ও অভাব-অনটন, অতপর বলো, আল্লাহর প্রিয় ও অনুগৃহীত দাস কারা-আমরা না তোমারা? 

হযরত সালেহ (আ) উত্তরে বলতেন, তোমাদের এই সুখ-সম্ভোগ ও আরাম-আয়েশ এর উপর দম্ভ করো না এবং আল্লাহর সত্য নবী ওসত্য দীনকে নিয়ে এভাবে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করো না। কেননা যদি তোমাদের গর্ব, দম্ভ ও দুশমনী এ অবস্থাই থাকে তবে চোঁখের পলকে তোমাদের সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। অতঃপর না তোমরা থাকবে, আর না তোমাদের প্রাচুর্য ও ঐশ্বর্য? নিঃসন্দেহে এসব কিছুই আল্লাহর নিয়ামত (অনুগ্রহ) । তবে এ শর্তে এসব অধিকারীরা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং তার বাধ্য ও অনুগত থাকবে। অপরদিকে এসবই আবার আল্লাহর শাস্তি ও অভিশাপের সামগ্রী, যদি এসবকে গর্ব ও দাম্ভিকতার সাথে গ্রহণ ও ভোগ করা হয়। অতএব এটা ধারণা করা একটা সাংঘাতিক ধরনের ভ্রান্তি যে, আরাম-আয়েশের প্রতিটি সামগ্রীই আল্লাহর সন্তুষ্টির নিদর্শন বা ফলশ্রুতি।

সামূদ জাতির কাছে এও বিস্ময়কার ছিল কি করে তাদেরই মধ্যে থেকে একজন মানব আল্লাহর নবী মনোনীত হয়ে খোদ আল্লাহর আদেশ তাদেরকে শুনাতে পারে ? তারা চোখ কপালে তুলে বলতঃ কী, আমাদের মধ্যে থেকেও তার উপর (আল্লাহর) উপদেশ নাযিল হয় ?

 অর্থাৎ আমাদের মধ্যে থেকে কেউ নবী হলে তার যোগ্য তো সালোহ নয়, বরং আমরাই। আবার কখনো কখনো তারা তাদের কওমের দুর্বল ব্যক্তিদের (যারা মুসলমান হয়েছিল) সম্বোধন করে বলতঃ তোমরা কি জান সালেহ আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত? (সূরাঃ আল-আরাফ, আয়াতঃ৭৫)

মুসলিমগণ উত্তর দিতঃ তার (সালেহের) প্রতি যে বাণী প্রেরিত হয়েছে আমরা তাতে মুমিন। (সূরাঃআল-আরাফ, আয়াতঃ৭৫)

তখন ঐ দাম্ভিকরা ক্রোধরতস্বরে বলতঃ তোমরা যা বিশ্বাস কর আমরা তা অস্বীকার করে। (সূরাঃআল-আরাফ,আয়াতঃ৭৬) যা হোক, হযরত সালেহ (আ)-এর দাম্ভিক ও অহংকারী কওম তাঁর নবুওতের দাওয়াত ও নসীহত-উপদেশ অস্বীকার করলো এবং দাবি জানালো, আল্লাহর নিদর্শনের (মুজিযার)“। তখন সালেহ (আ) আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানালেন এবং সে ফরিয়াদ কবুল হওয়ার পর স্বীয় কওমকে সম্বোধন করে বললেন, তোমাদের দাবিকৃত আল্লাহর নিদর্শন উটনীর আকারে দেয়া হলো। দেখ, যদি তোমরা একে কষ্‌ট দাও তবে এটাই তোমাদের ধ্বংসের কারণে পরিণত হবে। আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের ও এ উটনীর মধ্যে পানি পানের পালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। একদিন তোমাদের জন্য, আর একদিন ওর জন্য। অতএব এতে যেন কোন ব্যতিক্রম না হয়।

পবিত্র কুরআন থেকে নাকাতুল্লাহ (আল্লাহর উটনী) আখ্যা দিয়েছে-যদিও সব সৃষ্টিরই মালিক আল্লাহ। আর তা এই প্রেক্ষিতে কওমে সামূদ একে আল্লাহর নিদর্শন হিসাবেই দাবি করেছিল এবং এই উপস্থিত বৈশিষ্ট্যও মর্যাদার দরুন অত্যন্ত সঙ্গত কারণে তাকে নাকাতুল্লাহ আখ্যা দেয়া হয়েছে।

(১) পবিত্র কুরআন থেকে এ ব্যাপারে শুধু দুটি কথা প্রমাণিত হয়েছে। একঃ কওমে সামুদ হযরত সালেহের কাছে নিদর্শন (মুজিযা) দাবি করেছিল এবং তিনি সে দাবি অনুযায়ী উটনীকে নিদর্শন হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। দুইঃ হযরত সালেহ (আ) তাঁর কওমকে সাবধান করে দিয়েছিলেন তারা যেন এটাকে কোন কষ্ট না দেয় এবং পানি পানের পালা যেন নির্ধারণ করে এভাবে যে একদিন উটনীর জন্য এবং অপর দিন সমগ্র কওমের জন্য। যদি তারা একে কষ্ট দেয় তবে এটাই তাদের ধ্বংসের কারণে পরিণত হবে। শেষ পর্যন্ত তারা উটনীকে হত্যা করল এবং আল্লাহর শাস্তিতে নিজেরাও ধ্বংস হলো।

উপরোক্ত দুটি কথার অতিরিক্ত যা কিছু ব্যক্ত করা হয়ে থাকে তা হয় হাসীদের বর্ণনার উপর নয়তো বাইবেলে অথবা প্রাচীন ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে। এ ক্ষেত্রে হাদীসের যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সেসবের মর্যাদা আখবারে আহাদ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। তবে মুহাদ্দিসদের মতে এই আখবায়ে আহাদ (যে হাদীসের বর্ণনা-শৃঙ্খলের এক বা একাধিক স্তরে মাত্র একজন বর্ণনাকারী রয়েছে) –এর কোন কোনটির রেওয়াতে সহীহ বিশুদ্ধ) আবার কোনটি যয়ীফ (দুর্বল)। এ কারণেই হাফিজ ইমাদুদ্দীন বিন কাসীর নাকাতুল্লাহর অস্তিত্বের আসার রেওয়াথসমূহকে রেওয়ায়েতের বর্ণনা-শৃঙ্খলের সনদের রীতি (উসূল) অনুযায়ী উদ্বৃত করেন নি বরং সেসবকে ঐতিহাসিক ঘটনার মতই লিপিবদ্ধ করেছেন।

এই উটনীকে নাকাতুল্লাহ বলে এ ইঙ্গিতেও প্রদান করা হয়েছে এই নিদর্শন একটি বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। কিন্তু সামুদের কওমের দূভার্গই বলতে হবে তারা দীর্ঘদিন একে বরদাশত করতে পারল না।

তারা পরস্পরের সাথে মিলিত হয়ে ষড়যন্ত্র পাকালো। সিদ্ধান্ত হলো কীদার বিন সালিফ উটনীর উপর হামলা করবে এবং অবশিষ্টরা তাকে সাহায্য করবে।এভাবেই তাঁর উটনীকে হত্যা করলো। হযরত সালেহ যখন এটা জানতে পারলেন তখন তার আখিযুগল অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠলো। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে বললেন, দুর্ভাগ্য জাতি, শেষ পর্যন্ত ধৈর্য হারা হলে? যাও, এবার আল্লাহর আযাবের অপেক্ষায় থাক। তিন দিনের মধ্যে সেই আতংকজনক শাস্তি আসবে এবং তোমাদের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই সামূদ জাতি যখন হযরত সালেহ (আ)-এর সত্য প্রচারের দরূন একেবারে বিরক্ত হয়ে উঠল তখন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কওমের অপরাপর ব্যক্তির সামনে দাবী জানালো, হে সালে! যদি তমি সত্যি আল্লাহর রসূল হয়ে থাক তবে আমাদেরকে কোন নিদর্শন দেখাও, যাতে আমরা তোমাকে সত্য বলে মেনে নিতে পারি।

হযরত সালেহ (আ) বললেন, এমন যেন না হয় নিদর্শন আসার পরও তোমরা সত্যের অস্বীকার এবং আল্লাহর অবাধ্যতার উপর অনড় থাক। তখন ঐ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অন্যন্ত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করলো তারা সঙ্গে সঙ্গে ঈমান আনবে। সালেহ (আ) তাদেরকে জিজ্ঞসা করলেন, তোমরা কি ধরনের নিদর্শন চাও? তারা দাবী করলো, তুমি এই সম্মুখবর্তী পাহাড়ের মধ্যে থেকে কিংবা রসতি-সীমান্তে এই যে পাথর স্থাপন করা হয়েছে তা থেকে এমন একটি উটনিী বের করে নিয়ে এস যেটি হবে গর্ভবতী, তবে সাথে সাথে বাচ্চা প্রসব করবে। হযরত সালেহ (আ) আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানালেন এবং তখনই সবার সামনে পাহাড় (কিংবা পাথর) থেকে একটি গর্ভবতী উটনী বেরিয়ে এলো এবং বাচ্চা প্রসব করলো।

এটা দেখে জুনদু বিন আমর নামীয় জনৈক নেতা সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম কবুল করলো এবং অপরাপর সবাইকে চিরদিনের জন্য পর্যুদস্ত করে ছাড়বে। সাইয়িধ আলূসী তাঁর তাফসীরে রুহল মাআনীতে লিখেছেন যে, সামূদ কওমের উপর শাস্তি নাযিল হওয়ার আলামত পরদিনে সকাল থেকেই জাহির হতে শুরু করে। অর্থাঃ প্রথম দিন তাদের সকলের চেহারা েএমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল যেমন কোন আতংকের প্রাথমিক অবস্থায় হয়ে থাকে। দ্বিতীয় দিন তাদের চেহারা লোহিতবর্ণ ধারণ করলো, যেন এটা ছিল ভয় ও নেতারাও তাকে অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলো।

কিন্তু ধর্মমন্দিরের পুরোহিত যু‘আব বিন আমর, রুবার বিন সফর প্রমুখ তাদেরকে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত রাখল। এভাবে অন্যদেরকেও তারা ইসলাম গ্রহণে বাধা দিল। এবার হযরত সালেহ (আ) কওমের সমগ্র জনগণকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন, দেখ এই নিদর্শন তোমাদের দাবি অনুসারেই দেয়া হয়েছে। আল্লঅহর সিদ্ধান্ত এ পানি পানের পালা নির্ধারিত হবে একদিন এ উটনীর জন্য এবং একদিন সমগ্র কওম ও তাদের গৃহপালিত জন্তু জানোয়ারের জন্য। সাবধান, একে কোনরূপ কষ্ট দিও না। যদি এরূপ কর তবে তোমাদের ভাল হবে না।

কওম এ বিস্ময়কর মুজিযা দেখে ঈমান না আনলেও তাদের আন্তরিক স্বীকৃতি, একে কষ্ট দেয়া থেকে তাদের বিরত রাখলো। অতপর এই নিয়ম হল, একদিন শুধু উটনী পানি পান করত এবং সমগ্র জাতির তার দুধ থেকে উপকৃত হত, আর অপর দিন পালাক্রমের সমগ্র কওম এবং তাদের গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ার পানি পান করত। এ দিন উটনী এবং তার বাচ্চা নির্বিঘ্নে চারণভূমিতে চড়ে বেড়াতে এবং তাতেই তৃপ্ত থাকত। কিন্তু ধীরে ধীরে একথাও তাদের কাছে অপছন্দনীয় ঠেকলো। তারা আপোসে সলা-পরামর্শ করতে লাগলো, যদি এই উটনীকে খতম করে দেয়া যায় তবে পালার ঝামেলা থেকে নিস্কৃতি পাওয়া যাবে। কেননা আমাদের এবং আমাদের চতুস্পদ জন্তুর উপর এরূপ শর্তারোপ একটা অসহ্যকর ব্যাপার।

আতংকের দ্বিতীয় স্তর। তৃতীয় দিন তাদের চেহারা কৃষ্ঞবর্ণ ধারণ করলো, যেন এটা ছিল ভয় ও আতংকের তৃতীয় স্তর। অতপর শুধু মৃত্যুর স্তরই অবশিষ্ট ছিল। তিন দিনের এই আলামতসমূহ যদিও তাদের চেহারাকে ক্রমাদ্বয়ে ফ্যাকাশে, লাল ও কালো করে দিয়েছিল, কিন্তু এসব রংয়ের পর্যায় ক্রমিক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট বলে দিচ্ছিলো তাদের অন্তরে সংগোপন হলেও হযরত সালেহ (আ)-এর সত্যতার প্রতি বিশ্বাস বিরাজ করেছিলো এবং তারা শুধু বিদ্বেষ ও দুশমনির কারণে তাকে আপোসে এরূপ কথাবার্তা চললেও উটনীকে হত্যা করবে এমন দুঃসাহস কারো হচ্ছিল না।

কিন্তু সাদূক নামীয় এক সুন্দরী রমণী মাসদা নামক এক ব্যক্তির কাছে নিজেকে এবং উনায়বা নামীয় এক ধনবতী রমণী নিজের সুন্দরী কন্যাকে কীদার নামক এক পুরুষের কাছে সমর্পণ করে বললো, যদি তোমরা উভয়ে এই উটনীকে হত্যা করতে পার তবে এই দুই রমণীর উপর তোমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং তোমরা এদেরকে স্ত্রীরূপে উপভোগ করতে পারবে। শেষ পর্যন্ত কীদার বিন সালিফ এবং মাসদা এ কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত হলো, তারা রাস্তায় গোপনে বসে থাকবে এবং উটনীটি যখন চারণভূমির দিকে যাবে তখন তার উপর হামলা করবে। অপর কিছু ব্যক্তি ও তাদেরকে এ ব্যাপারে সাহার্য সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিল।

কাজ এ ভাবেই এগিয়ে চললো। চক্রান্তের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তারা উটনীকে হত্যা করে তবে ছাড়লো। অতপর আপোসে শপথ নিল, রাত হওয়ার সাথে সাথে আমরা সকলে মিলে সালেহ এবং তাঁর পরিবার সংসারকেও হত্যা করবো। অতঃপর তার বদ্ধু-বান্ধবকে এই বলে আশ্বস্ত করবো এ কাজ আমাদের দ্বারা হয় নি।

উটনীর বাচ্চা মায়ের হত্যাকান্ড লক্ষ্য করে পাহাড়ের দিকে ছুটতে লাগলো এবং উচ্চস্বরে চিৎকার করতে পাহাড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।

অস্বীকার করছিলো। যাহোক আল্লাহর হুকুম অমান্য করার মত অপরাধ যখন তারা করেই ফেললো এবং তার পরিণাম স্বরূপ ভয়ানক আযাব অবতরণের দুঃসংবাদ হযরত সালেহ (আ)-এর কাছ থেকে শুনলো তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের চেহারায় আতংক ও ভয়-ভীতির সেই রং ও চিহ্নসমূহ ফুটে উঠতে লাগলো যা অত্যাসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস জন্মালে পর ভয় আতংকের কারণে দুরাচারীদের চেহারায় ফুটে উঠে।                

মোটকথা, তিন দিন পর সে প্রতিশ্রুত সময় এসে গেল এবং রাতের বেলা একটি আতংকজনক বিকট আওয়াজ প্রত্যেকটি ব্যক্তিকে সেই অবস্থায়ই ধ্বংস করে দিল, যে অবস্থায় তারা ছিল।

সালেহ (আ) যখন এটা জানতে পারলেন তখন অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে কওমকে সম্বোধন করলেন, আমি যা ভয় করছিলাম শেষ পর্যন্ত তা-ই ঘটলো। এবার তোমরা আল্লাহর আযাবের অপেক্ষা কর যা তিন দিন পর তোমাদের সমূলে ধ্বংস করে দেবে। অতঃপর বিদ্যুৎ ঝলকানি ও বজ্রপাতের আযাব এলো রাতের বেলা তাদেরকে একেবারে ধ্বংস করে দিল, এবং এ ঘটনা ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য একটি শিক্ষামূলক দৃষ্টান্ত হয়ে রইলো।

এ ঘটনার সাথে মুহাদ্দিস ইবনে কাসীর কিছু রেওয়ায়েতেরও উদ্বৃতি দিয়েছেন। যেমন, তাবুক যুদ্ধ উপলক্ষে যখন রসূল (সঃ) হিজরত অতিক্রম করছিলেন তখন সাহাবীরা সামূদ জাতির কুয়া থেকে পানি উঠালো এবং তাতে আটা মেখে রুটি তৈরি করতে আরম্ভ করলো। নবী করীম (সঃ) যখন তা জানতে পারলেন তখন তিনি ঐ পানি ফেলে দিয়ে হাঁড়িসমূহ উল্টিয়ে তাতে রাখা আটা বিনষ্ট করে ফেলার হুকুম দেন এবং বললেন, এটা সেই বসতি যার উপর আল্লাহর আযাব নাযিল হয়েছিল। এখানে অবস্থান করো না এবং এখান থেকে কোনভাবে উপকৃতও হয়ো না, বরং আগে বেড়ে অন্য কোথাও গিয়ে তাঁবু খাটাও। এমন যেন না হয় (এখানে অবস্থান করার ফলে) তোমরাও বিপদে পতিত হও।

পবিত্র কুরআন এই বিধ্বংসী আওয়াজকে কোথাও সোয়া-ইকা (কড়কড় শব্দ সম্বলিত বিজলী) কোথাও রাজফা ভূকম্পন সৃষ্টিকারী বস্তু) কোথাও ত্বয়াগিয়া (আতংকজনক) আবার কোথাও সাইহা (বিকট আওয়াজ) নামে অভিহিত করেছে। বিভিন্ন শব্দের এই ব্যবহার, একই তত্বের বিভিন্ন প্রকাশভঙ্গি মাত্র। এর দ্বারা ঐ আযাবের অতীব আতংকজনক দিকটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মাত্র। এবার তুমি এমন একটি ধাবমান বিজলীর কথা কল্পনা যা পলকে পলকে চমকাচ্ছে কড়কড় করছে, বিকট আওয়াজ তুলছে, কখনো পূর্বদিকে অন্য এক রেওয়ায়েতে রয়েছে, রসূল (স) বলেছেন, তোমরা হিজরের এ বসতিসমূহে অন্তরে আল্লাহর ভয় নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে এবং রোদন করতে করতে প্রবেশ কর, অন্যথায় তাতে প্রবেশেই করবে না। এমন যেন না হয় তোমরাও নিজেদের গাফলতির কারণে আল্লাহর আযাবে জড়িয়ে পড়।

অপর এক রেওয়ায়তে আছে, যখন রসূলুল্লাহ (সঃ) হিজর প্রবেশ করেন তখন বলেন, আল্লাহর কাছ থেকে নিদর্শনাদি তবল করো না। দেখ, সালেহ (আ)- এর কওম নিদর্শন তবল করেছিল। তখন (নিদর্শনরূপী) ঐ উটনী পাহাড় থেকে বের হত এবং নিজের পালা অনুযায়ী খেয়ে দেয়ে পুনরায় পাহাড়ে ফিরে যেত। যেদিন তার পালা থাকত সেদিন সে সামূদ কওমকে নিজের দুধ দ্বারা পরিতুষ্ট করত। কিন্তু সামুদরা শেষ পর্যন্ত সীমলাংঘন করল। তারা উটনীর পায়ের গোছা কেটে তাকে হত্যা করল।

প্রতিফল এ হলো তাদের উপর মহানাদ-এর আযাব অবতীর্ণ হলো এবং তারা তাদের ঘরের মধ্যেই লাশ হয়ে পড়ে রইলো। শুধু আবু রগাল নামক এক ব্যক্তি হরম শরীফে গমন করার দরুন তা থেকে রেহাই পেল। কিন্তু যখনই সে হরম থেকে বেরিয়ে এল, সাথে সাথে ঐ শাস্তির শিকারে পরিণত হল। হাফিজ ইবনে কাসীর উক্ত রেওয়ায়েত তিনটি মুসনাদে আহমদ থেকে সনদসহ বর্ননা করেছেন। (তারিখে ইবনে কাসীর ঃ প্রথম খন্ড, পৃষ্টা ১৩৮-৩৯)

গোপন মাসাআলা

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Spread the love

Leave a Comment