নবীগণ নিস্পাপ ইসলামী আকীদা। ইসমতে আম্বিয়া এর অর্থ

নবীগণ নিস্পাপ ইসলামী আকীদা। ইসমতে আম্বিয়া এর অর্থ: হযরত আদম (আ) যখন নবী ছিলেন তখন তিনি কিভাবে আল্লাহর হুকুমের অবাধ্য হলেন? নবীরা তো মাসুম (নিস্পাপ) ইসমত নিস্পাপ হওয়াটা অবাধ্যতা ও পাপাচারের বিপরীতে ব্যবহৃত হয়।

হযরত আদমের ইসমতের উপর আলোচনা করার পূর্বে সংক্ষিপ্ত ভাষায় ইসমত এর অর্থ ও তাৎপর্য সম্পর্কে আলোকপাত করা দরকার, যাতে আগামীতেও অনুরূপ স্থলে মন্দেহ সংশয়ের বিন্দুমাত্র অবকাশ না থাকে।

মহান স্রষ্টা মানবের সৃষ্টিতে দুটি বিপরীত শক্তির সমাবেশ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ, তাকে গুনাহ ও পুণ্য এ দু‘ধরনের শক্তিই দেয়া হয়েছে। সে গুনাহও করতে পারে, আবার পূন্যও করতে পারে। সে যেমন সৎ ইচ্ছার অধিকারী তেমনি অসৎ ইচ্ছারও। আর সত্যি কথা বলতে গেলে তার মানবিক মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের রহস্যও এখানেই।

এই দুটি শক্তির অধিকারী মানবজাতির হেদায়েত ও পথ প্রদর্শনের জন্য কোন কোন যামানায় আল্লাহ তাআলা তাদেরই মধ্যে থেকে কোন কোন ব্যক্তিকে রসূল ও নবী হিসাবে মনোনীত করেন। আর এদেরই সর্বশেষ ব্যক্তি হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ (স)।

যখন কোন ব্যক্তিকে নবুওতের জন্য মনোনীত করা হয় তখন এটা তার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ে তিনি তার কথায়, কর্মে ও সংকল্পে সব ধরনের গুনাহ থেকে পবিত্র এবং সব ধরনের অবাধ্যতা থেকে মুক্ত থাকবেন , যাতে করে তিনি সঠিক অর্থে আল্লাহ তাআলার রিসালাতের দায়িত্ব আন্জাম দিতে পারেন। কোননা যিনি নিজেই পথভ্রষ্ট তিনি অপরকেপথ দেখাবেন কি করে?

অপর কথায়, তিনি যেমন একজন মানব পানাহার করেন, শয়ন করেন, সংসার পরিজনের সাথে জীবন-যাপন করেন তেমনি একজন মানব যার কাজকর্ম ও সংকল্প গোনাহ থেকে পবিত্র।কেননা তিনি প্রতিটি পূন্যের হাদী, পথ প্রদর্শনকারী এবং সর্বোপরি আল্লাহর প্রতিনিধি অপরাপর মানবের মত তার মধ্যে বিপরীতধর্মী দুটি শক্তিই রয়েছে, তবে কর্ম ও সংকল্প অপরাধ থেকে মুক্ত। গুনাহ করাটা তার জন্য অসম্ভব করে দেয়া হয়েছে-যাতে তার প্রত্যেকটি আচার আচরণ মুমেনের জন্য আদর্শ হিসাবে বিবেচিত হতে পারে। তবে মানব হিসাবে তা থেকে কিছু ভুলভ্রান্তি ও ত্রুটিবচ্যুতি হওয়ার সম্ভাবনা অবশিষ্ট থাকে এবং কখনো কখনো তা হয়ে যায়ও। তবে সাথে সাথেই তাদেরকে হুশিয়ার করে দেয়া হয় এবং তারা তা থেকে দূরে সরে পডেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে ভুল ত্রুটির অর্থ না হয় বুঝা গেল। কিন্তু যাল্লাহ বা পদষ্থলনের অর্থ কি? উত্তর এই, পদস্থলনের সেই কর্মকে বলা হয় যার সংকল্পে আদর্শ লংঘন এবং যার বাস্তবায়নে অবাধ্যতা ও দাম্ভিকতা রয় না। প্রকৃতপক্ষে কর্মটি জঘন্য নয় বরং তা করলেও করা যায়, তবে কর্তা এমনি মর্তবা সম্পন্ন, এ কাজ করাটা তার বিরাট মর্তবার সামনে কিছুটা হালকা ও অবমাননাকরই মনে হয়। তবে তিনি তা করে ফেলেন এ ধারণায়, এটা আল্লাহ তাআলার অসন্তষ্টির কারণ হবে না।

যাহোক নবীদের উপর আল্লাহ তাআ‘লার বিশেষ সতর্ক সৃষ্টি থাকে। তাই তাদের দ্বারা অনুরূপ কোন ত্রুটিবিচ্যুতি হলেও আল্লাহ তাআলা সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে এ মর্মে হুশিয় একাজ করা তোমার জন্য অসমীচীন ও মানহানীকর মর্যাদার এ পার্থক্যটিকে একটি আরবী প্রবাদ বাক্যে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

পুণ্যবান দাসদের সাধারণ পুণ্য কর্ম, আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত দাসদের ক্ষেত্রে দৃস্কর্ম তুল্য।

এটা এ জন্য, আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত একজন দাস কিসে আল্লাহর সন্তষ্টি রয়েছে, তা বুঝতে ভুল করবে কেন? যাহোক এক্ষেত্রে আল্লাহর এ বিধান সচল রয়েছে, তিনি এ ধরনের পদস্থলনের ক্ষেত্রে প্রথম প্রথম অত্যন্ত শক্তভাষায় নবী রসূলদেরকে তাদের এ ত্রুটির কথা স্মরণ করিয়ে দেন,অতপর অন্যত্র আসল ব্যাপারটি প্রকাশ করে নবী ও রসূলদের এই কর্মকে নগণ্য ত্রুটি বিচ্যুতির পরিসীমায়ই নিয়ে আসেন এবং নিজেই তাদের পক্ষ থেকে ওজর উত্থাপন করেন যাতে কোন খোদাদ্রোহী কোন নবী বা কোন রসূলের উপর অযথা পাপাচারের অভিযোগ উত্থাপন করার সুযোগ না পায়।

মোটামুটি এ পদ্ধতির নামই ইসমতে আম্বিয়া। আর এটা হচ্ছে ইসলামী আকা‘য়েদের (দীনী বিশ্বাস) একটি মেীলিক আকীদা এই বিষয়টি যদিও দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনা ও তর্ক বিতর্ক সাপেক্ষ তবে দলীল প্রমাণাদি নিয়ে চিন্তা গবেষণার পর তার সারাংশ তাই দাঁড়াবে যা উপরে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

হযরত আদমের ইসমতঃ

উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে হযরত আদমের ঘটনা সম্পর্কে চিন্তা করুন। পবিত্র কুরআন সূরা বাকারায় যখন এই ঘটনা বর্ণনা করেছে তখন পরিস্কার করে দিয়েছে আদমের এই ভ্রান্তি গুনাহ কিংবা অবাধ্যতা নয় বরং সাধারণ ধরনের একটি পদস্থলন মাত্র। কিন্তু শয়তান তা থেকে তাদের পদস্থলন ঘটাল এবং তারা যেখানে ছিল সেখানে থেকে তাদেরকে বহিষ্কৃত করলো।(সূরাঃবাক্বারাহ, আয়াতঃ৩৬)

অতপর সূরা আরাফ ও সূরা ত্বয়াহা‘র দুটি স্থানে এই ঘটনাকে শয়তানের ‘ওয়াসওয়াসার‘ (কুমন্ত্রণা) ফলশ্রুতি আখ্যা দেয়া হয়েছে। যেমনঃ অতঃপর শয়তান তাঁকে কুমন্ত্রণা ‍দিল।

(সূরাঃ ত্বা-হা, আয়াতঃ১০)

এবং ত্বয়াহা‘র তৃতীয় স্থানে স্বয়ং আল্লাহতাআ‘লা এ পদস্থল, সর্বপ্রকার সংকল্পগত ও কর্মগত গুনাহ থেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন এবং তার ইসমত (নিষ্পাপ হওয়ার) –এর বিষয়টিকে আরও সুদৃঢ় ও সুপ্রমাণিত করে দিয়েছেন।

আমি তো ইতিপূর্বে আদরেম প্রতি হুকুম করেছিলাম কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল, (একারণে) আমি তাঁকে সংকল্পে দৃঢ় পাইনি। (সূরাঃ ত্বাহা-আয়াতঃ১২৫)

এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে হযরত আদম (আ) কোন প্রকার গুনাহ করেননি। বরং শয়তানের কুমন্ত্রণাই তার পদস্থলনের হেতু হয়েছে- আর তাও হয়েছে অজ্ঞতাবশত এবং ভুলে যাওয়ার কারণে।

উপরোক্ত আলোচনা পর্যালোচনার পর সূরা ত্বয়াহার নিচের আয়াতের অর্থ আপনা আপনি স্পষ্ট হয়ে যায়। আদম তার প্রভুর নির্দেশ পরিপূর্ণ করলো না, ফলে সে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।(সূরাঃত্বা‘হা, আয়াতঃ১২১)

সাধারণভাবে ইসইয়ান ও গাওয়েত এর যে অর্থ করা হয়ে থাকে আমরা এখানে তার করিনি।আমরা যা করেছে তা কোন অপ্রাসাঙ্গিক ব্যাখ্যা –বিশ্লেষন অনুযায়ী নয় বরং শাব্দিক ও সরাসরি অর্থ অনুযায়ী। আরবী ভাষার বিখ্যাত অভিধান গ্রন্থ লিসানুল আরব আকরাবুল মাওয়ায়েদ প্রভৃতিতে আছে আল মাসিয়াত পদস্থলন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এমনিভাবে গাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়।

মোটকথা, ঘটনা সম্পর্কিত যে সব আয়াতে হযরত আদম (আ) এর সম্মান মর্তবা, আল্লাহ কর্তৃক তাঁকে প্রতিনিধিত্বের জন্য মনোনয়ন ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে সেগুলোকে পৃথক পৃথক করে পাঠ করা উচিত নয়, যেমন আপত্তি উত্থাপনকারী সন্দেহ প্রবণ ব্যক্তিরা করে থাকে। এতে কুরআনের সঠিক অর্থ বুঝার ক্ষেত্রে জটিলতা এবং ভুল ভ্রান্তি দেখা দেয়। বরং সব আয়াতকে একত্রে পাঠ করা উচিত। গভীর ভাবে অধ্যয়ন করলে একথা দিবালোকের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে হযরত আদমের ইসমত একটি অনস্বীকার্য ব্যাপার। এতে সন্দেহ সংশায়ের কোন সুযোগ নেই। আর যদি আসা অবাধ্য হল এবং গাওয়া পথভ্রষ্ট হলো কে সাধারণ অর্থ গ্রহন করা হয় তবে সেই নীতিকে সামনে রেখে পুর্বাপর বিষয়টি বিবেচনা করতে হবেÑ যা উপরে বর্ণনা করা হলো। অর্থাৎ কুরআনের বিভিন্ন আয়াত যে আদমের নবুওত, সাফওয়াত, খেলাফত প্রভৃতি উচ্চমর্তবার কথা বর্ণনা করেছেন এ আয়াতে সে আদমেরই পদস্থলনকে এত শক্ত ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে এজন্য, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছে এবং তার সাথে সরাসরি কথোপকথন করেছে এমন ব্যক্তির পক্ষে এ ধরনের পদস্থলন অথ্যান্ত অসমীচীন এবং বেমানান, যদিও সাধারণ সৎকর্শশীল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এটা অতি সাধারণ ব্যাপার ছাড়া কিছু নয়।

হযরত আদম হাওয়া () করুন অবস্থা

বেহেশত হতে হযরত আদম (আ) সরন্দীপে ও বিবি হাওয়া জেদ্দায় পতিত হয়ে চারদিকে অন্ধকার দেখতে লাগলেন। জনমানবহীন এমন এক অপরিচিত মর্তভূমিতে এভাবে পতিত হয়ে তারা যেন একবারে অকুল দরিয়ায় ভাসলেন। যদি দুজন একই সাথে থাকতে পারতেন তবু হয়ত বা মন্দের ভাল হত, কিন্তু এ নতুন পৃথিবীতে কে কোথায় পতিত হলেন, কেউই তা জানতেন না। দুরবর্তী জায়গায় বসে দুজনেই কেদে কেদে বুক ভাসাতে লাগলেন।

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, হযরত আদম (আ) ও বিবি হাওয়া পরস্পর বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একাধারে তিনশত বছর ধরে ত্রুন্দন করেছিলেন। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় চল্লিশ বছরের কথাও উল্লেখ রয়েছে। তবে সময় যাই হোক না কোন, পরিস্থিতির ভয়াবহতায় তাদের অন্তর দুঃখ, অনুতাপ ও ভীতি-বেদনার আঘাতে ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল।

হযরত আদম () এর দোয়া

হযরত আদম (আ) স্বীয় ভূলের কারণে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ঐ সময় তিনি আল্লাহর কাছে যে দোয়া করেছিলেন তা সূরা আরাফে বর্ণিত আছেঃ

অর্থাৎঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নিজেদের উপর বড় জুলুম করেছি, অতঃপর যদি তুমি আমাদেরকে মাফ না কর আর আমাদের প্রতি দয়া না কর তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে যাব। (সূরাঃ আরাফ, আয়াত ঃ২৩)

এটা মানব হৃদয়ের চরম ও পরম আকুতি, যা ভুল-ত্রুটির ক্ষেত্রে অনায়াসেই বহিঃপ্রকাশ হয়ে থাকে । সত্যিই এ আকুতি প্রতিধানযোগ্য। অন্য একস্থানে হযরত আদম ও হাওয়া (আ) উভয়ে এ দোয়া করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে।

অর্থাৎ তারা উভয়ই (আদম ও হাওয়া) প্রার্থনা করেছিলেন, (হে আল্লাহ) যদি তুমি আমাদেরকে সৎ সন্তান দান কর তবে আমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করব। (সূরাঃ আরাফ)

নামাজের মাসআলা

আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ভিজিট করুন

Leave a Comment