বর্তমান সমাজে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম

বর্তমান সমাজের মিলাদ ও কিয়াম বিদআত এবং অতি ভয়াবহ গুণাহের একটি কাজ। একদিকে এ বিদআত, কুফর, শিরক এর পরেই যা সর্বাধিক মারাত্মক বড় গুণাহ। অপর দিকে এ বিদআত হতে তাওবাও নসীব হয় না। কেউ সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়াতে লিপ্ত হলে অথবা মিথ্যা বলার অভ্যাস থাকলে এগুলিকে কেউ হালাল বা বৈধ মনে করে না। বরং যে ব্যক্তি এগুলিতে লিপ্ত হয় সেও উহাকে গুনাহ্ মনে করে। বিধায় যখন বুঝে আসে বা অন্তরে আযাবের ভয় পয়দা হয়, তখন সে তওবা করে নেয় বা তাওবা করার প্রয়োজন মনে করে। কিন্তু বিদআত বর্তমান সমাজে বিশেষ করে মিলাদ-কিয়াম যে পদ্ধতিতে চালু আছে, তাহা নাজায়েজ ও কবিরা গুনাহ হাওয়া সত্ত্বেও বাহ্যিক দৃষ্টিতে নেক আমল মনে করে তাহা সওয়াবের নিয়তে করা হয়। বিধায় উহা থেকে তওবা করার চিন্তা বা প্রয়োজন মনে না করায় গুনাহকে নেকী মনে করে কুফরির দ্বারপ্রান্তে গিয়ে উপনিত হওয়া সত্ত্বেও তাওব নসীব হয় না। মনে মনে ভাবে সওয়াবের কাজই তো করছি। এর জন্য আবার তওবা কিসের? পরিশেষে তওবা করা ছাড়াই তার মৃত্যু হয়। যে ব্যক্তি গুনাহের কাজকে নেকীর কাজ মনে করে তার পরিণাম জাহান্নাম। এ জন্য বিদআত সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা এবং উহা থেকে সম্পূর্ণ রূপে বেঁচে থাকা সকলের জন্য একান্তই জরুরী। কেননা রাসূলে আকরাম (সাঃ)  বিদআত থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর ভাবে উম্মতকে হুশিয়ার করেছেন এবং বিদআতের পরিণাম যে কঠিন ভয়াবহ তাহাও উম্মতকে জানিয়েছেন। যার বর্ণনা ইতিপূর্বে  উল্লেখ করা হয়েছে।

মিলাদের অর্থ

মিলাদ শব্দটি আরবি مَوْلُوْدٌ  = مَوْلِدٌ  مِيْلَادٌ-  ولادة وولاد  আরবি মাসদার মূলধাতু হতে নির্গত। আরবি ভাষার যুগ  শ্রেষ্ঠ অভিধান আলকামুস, মিসবাহ, লিসানুল আরব, আল মুনজিদে এবং উর্দুসহ বিভিন্ন আরবি ডিকশনারীতে ولادة শব্দের অর্থ  জন্ম দেয়া, ভূমিষ্ট করা। আর মিলাদ ميلاد মাওলিদ  مولدএবং মাওলুদ مولود  শব্দের অর্থ জন্ম কাল, জন্মদিন, ভূমিষ্টের সময়।

অতএব হুজুর (সা.) এর মিলাদুন্নবী অর্থাৎ বিশ্বনবীর জন্মকাল বা সময় এবং তার জন্ম বৃন্তান্ত উম্মতের জন্য শুধু জানার বিষয়। যার মধ্যে মানার কোন বিষয় নেই। কিন্তু সিরাতুন্নবী পুরাটাই জানা এবং মানার বিষয়। সেহেতু মিলাদুন্নবী অর্থাৎ বিশ্ব নবীর জন্ম বৃত্তান্ত আলোচনার গুরুত্ব হতে সিরাতুন্নবী অর্থাৎ বিশ্বনবীর জীবন আদর্শ আলোচনা করা ও তা জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা উম্মতের জন্য অত্যন্ত জরুরী।

আল মুনজিদ- ১১০৬ পৃষ্ঠা, মিসবাহ পৃষ্ঠা ৯৬৬।

তাহলে মিলাদুন্নাবীর অর্থ হল হযরত রাসুল আকরাম (সা.) এর ভুমিষ্ট হওয়ার শুভ সময়, জন্ম কাল বা জন্ম দিন।

প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম শরীয়তে ভিত্তিহীন

কোন কাজ বা নিয়ম ইবাদত হওয়ার জন্য শরীয়তে তার কোন না কোন ভিত্তি বা দলিল থাকতে হবে। তা না হলে প্রত্যেকেই যদি নিজ নিজ খেয়াল খুশিতে বিভিন্ন কর্ম পদ্ধতি আবিস্কার করে সেটাকেই ইবাদত এবং শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত বলে দাবী করে বসে, তখন শরীয়ত একটি খেলনা বস্তুতে পরিণত হয়ে যাবে। জমির মালিকানা সঠিক হওয়ার জন্য যেমন দলিল পত্র থাকতে হয়। আর দলিল সম্পাদন হয় খতিয়ান, দাগ নং মৌজা ইত্যাদির দ্বারা। ঠিক তেমনি ভাবে শরীয়তের কোন আমল সঠিক বা সহি প্রমাণিত হতে হলে শরীয়তের দলিল তথা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, কিয়াস দ্বারা অবশ্যই প্রমাণিত হতে হবে এবং কোন কাজ বা আমল ইবাদত হিসাবে প্রমাণিত হতে হলে তা খতিয়ান তথা রাসূলে কারিম (সা:) এবং তার সাহাবাগণ, অতঃপর তায়েবীগণ ও তাবে তাবেয়ীন এই তিন যমানার সহিত মিলতে হবে তথা উল্লেখিত সোনালী যুগে উক্ত কাজের প্রমাণ থাকতে হবে। শরীয়তের যে কোন কাজ কর্ম পদ্ধতিগত ভাবে চার ভাগে বিভক্ত। যথা- হানাফি, মালেকী, শাফী ও হাম্বলী। যা শরীয়তের মৌজা হিসাবে ধরে নেওয়া যায়।

এখন দেখতে হবে বর্তমান সমাজে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম শরীয়তের কোন দলিল অথবা খতিয়ান বা মৌজাভূক্ত কিনা। ৩০ পারা পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতে উল্লিখিত মিলাদ ও কিয়ামের কথা ষ্পষ্ট অথবা ইশারা-ইঙ্গিতেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সহি হাদিসে তো দূরের কথা কোন জয়িফ হাদিস বা দুর্বল হাদিস দ্বারাও কেউ উক্ত প্রচলিত মিলাদ ও কিয়ামের পক্ষে দলিল দেখাতে পারবে না। ইজমা কিয়াস দ্বারাও সম্ভব নয়। উক্ত প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম শরীয়তের খতিয়ানভূক্ত  নয়, কেননা রাসূলে আকরাম (সা.) নিজ জীবনে কখন প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম করেন নাই এবং সাহাবাদের করতেও বলেন নাই। লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্যে হতে ছোট বড় এমন কি আদনা দরজার কোন সাহাবা থেকেও উহার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অতঃপর তাবেঈন, তাবে তাবেঈন, আয়িম্মায়ে মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিসীন, মুফাস্সিরীনগণ, চার মাযহাবের ইমামগণ তথা ইমাম আবু হানিফা (রা:), ইমাম মালেক (রা:), ইমাম শাফী (রা:), ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্মল (রা:), হাদিস জগতের ইমাম বুুখারী (র:), ইমাম মুসলিম (র:) ইমাম আবু দাউদ (রা:), ইমাম তিরমিজী (র:), ইমাম নাসায়ী (র:), ইমাম ইবনে মাজা (র:), ইমাম বাইহাকী ও ইমাম কানযুল উম্মাল (র:) গণ হতেও প্রচলিত মিলাদ ও কিয়ামের কোন প্রমাণ নেই। ইমাম তহাবী, ইমাম দারমী, আল্লামা জুনায়েদ বাগদাদী এমন কি কোন ফিকাহ্বিদ হতেও উহার কোন প্রমাণ নেই। তাছাউফের ইমাম বড় পীর হযরত শাহ আব্দুল কাদের জিলানী (র:), হযরত শাহ মুঈন উদ্দিন চিশতি (র:), হযরত শাহ বাহা উদ্দিন নক্শাবন্দী (র:) এবং হযরত শায়খ আহমাদ সারহান্দী, মুজাদ্দাদে আলফেসানী (র:) থেকেও এর কোন প্রমাণ নেই।

প্রচলিত মিলাদের সূচনা

প্রচলিত মিলাদের সমর্থক এবং বিরোধী সকলেই এক মত যে, ইসলামের সুচনা কাল থেকে শুরু করে সুদীর্ঘ ছয়শত বৎসর পর্যন্ত এই মিলাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৬০৪ হিজরী ১২ রবিউল আউয়ালে এই মিলাদের আয়োজন করা হয়। বারাহীনে কাতেয়া- পৃষ্ঠা- ১০৩, তারিখে মিলাদ, পৃষ্ঠা- ১৩, ফতুয়া রাশিদীয়া- পৃষ্ঠা-১১৪

আনুষ্ঠানিক ভাবে মিলাদের প্রচলন

৬০৪ হিজরীতে ইরাকের মুসল শহরে বাদশাহ আবু সাঈদ মুজাফ্ফর উদ্দিন কাওকারী (মৃত-৬৩০ হি:) এবং আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে মোহাম্মদ ইবনে দেহিয়া নামক জনৈক দরবারী আলেম দ্বারা সর্ব প্রথম এ প্রচলিত মিলাদের গোড়া পত্তন হয়। ১২ রবিউল আওয়াল ভিত্তিক এই অনুষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল আনন্দ উৎসব এবং নবী করিম (সা:) এর জন্য ইসালে সাওয়াব ও জিয়াফতের ব্যবস্থা। তারিখে ইবনে কাছির খন্ড নং- ১৩, পৃষ্ঠা নং- ১৩৬, তারিখে ইবনে খালকান, খন্ড- ৪, পৃষ্ঠা নং- ১১৭, ইখতিলাফে উম্মত ও সিরাতে মুস্তাকিম, খন্ড-১, পৃষ্ঠা নং- ৮৩।

মোট কথা বিশ্বনবী (সা:) এর ২৩ বছর নবুওয়্যাতের যুগের পর ১১ হিজরী হতে ৪০ হিজরী ১৭ রমজান পর্যন্ত আনুমানিক ৩০ বৎসর খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগের পর প্রায় ১১০ হিজরী পর্যন্ত সাহাবায়েকেরামের শেষ যুগ। এরপর প্রায় ২২০ হিজরী পর্যন্ত তাবেঈন, তাবে তাবেঈন-এর যুগের পর ৪০০ হিজরী পর্যন্ত ইমাম ও মুজতাহিদীনের যুগ। অতএব ৬০৩ হিজরী পর্যন্ত মহামনিষী ও সুফী সাধকদের যুগেও প্রচলিত মিলাদের অস্তিত্ব ছিল না। সর্ব প্রথম ৬০৪ হিজরী মোতাবেক ১২১৩ খৃষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিক ভাবে এ মিলাদের প্রচলন হয়। সুতরাং প্রচলিত মিলাদ অনুষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে বিদআত ও নাজায়েজ।

মিলাদের হাকিকত ও প্রকৃত মিলাদ

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِىْ رَسُوْلِ اللهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ –

তোমাদের জন্য আল্লাহ্র রাসূলের জীবনে রয়েছে উত্তম, অনুপম নমুনা ও আদর্শ। সূরা আহযাব, আয়াত- ১১।

হযরত রাসূলে আকরাম (সা:) এর শিশুকাল, যৌবন কাল, বৃদ্ধকাল, ব্যক্তিগত জীবন, সাংসারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, অর্থনৈতিক জীবন, তার আচার ব্যবহার, খাওয়া-দাওয়া, উঠা-বসা, চাল-চলন, লেন-দেন, চলা-ফেরা, কথা-বার্তা, হাসি-কান্না, শাসন-বিচার, দয়া-মায়া, ওজু-গোসল, নামাজ-রোজা, হজ্ব-যাকাত, আরাম-আয়েশ, দুঃখ-কষ্ট, লেবাস-পোশাক, বিবাহ-সাদী, দাওয়াত-জিহাদ, ইবাদত-বন্দেগী, যিকির-ফিকির মোট কথা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ে উম্মতের মাঝে আলোচনা পর্যালোচনার মাধ্যমে তার আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব হতে পারে। অতএব, রাসূলে কারীম (সা:) এর জীবন আদর্শ বর্ণনা করে মানব জীবনে তা প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়নের চেষ্টার নাম প্রকৃত মিলাদ বা মিলাদের হাকিকত বলে। এতে প্রচুর সাওয়াব ও নেকী রয়েছে। এই আলোচনা দ্বারা মানুষ তাদের জীবনে অনেক কিছু শিখতে পারে। একে আমরা সিরাত মাহফিলও বলে থাকি। এ ধরণের মিলাদকে কেউ বিদআত বলবে না। কারণ এ ধরণের মিলাদ বা সিরাত মাহফিল রাসূলে কারীম (সা.) এর যুগ থেকেই চলে আসছে।

কিন্তু এক শ্রেণির স্বার্থপর অর্থলোভী উলামায়েছু এই সহীহ্ মিলাদকে বাদ দিয়ে নিজেদের খেয়াল খুশিমত আরবি ও উর্দু ভাষায় কিছু দুর্বোধ্য ও কঠিন গদ্য-পদ্য, কুরআন শরীফের এক দুটি আয়াত, এক দুটি দরুদ, দু-একটি দোআ-কালাম কিছু কাওয়ালী, তাওয়াল্লাদ ইত্যাদি মিলিয়ে কোন রকম একটা জোড়াতালি দিয়ে পাঁচ মিশালী খিচুরী মার্কা একটি সংক্রীর্ণ প্রথাগত মিলাদ আবিস্কার করেছে। যার মধ্যে মনগড়া আরবি, উর্দূ, ফার্সী ও বাংলা ভাষায় কবিতা আকারে সুরালু কণ্ঠে মানুষের সামনে পেশ করে নাম দেওয়া হয়েছে মিলাদ শরীফ। নাউযুবিল্লাহ

অথচ প্রচলিত মিলাদ মাহফিলে রাসূলে আকরাম (সা.) এর জীবন আদর্শ নিয়ে কোন আলোচনাই হয় না। ফলে যুগ যুগ ধরে সরলমনা মুসলমান মিলাদ মাহফিলে যাওয়া আসা করে। কিন্তু তারা  বিশ্বনবী (সা.) এর আলোকিত উজ্জল জীবন আদর্শ থেকে কিছুই শিক্ষা অর্জন করতে পারে না। আসল জিনিস অর্থাৎ প্রকৃত মিলাদ বাদ দিয়ে নকল মিলাদ আবিস্কার করে মুসলিম সমাজকে আজ অন্ধকারে নিমজ্জিত করা হয়েছে। মানুষ নকলকে আসল মনে করে দুনিয়া ও আখিরাত বরবাদ করছে।

আসল টাকা আর জাল টাকা দেখতে তেমন পার্থক্য বুঝে আসে না। কিন্তু ব্যাংকে গেলে ঠিকই ধরা পড়ে যায়।

জাল টাকার আবিস্কারক যদি প্রশাসনের হাতে ধরা পরে তাহলে তো আর রেহাই নাই, সাথে সাথে জেলখানায় তার স্থান হয়ে যায়। তেমনি ভাবে শরীয়তের কোন আসল আমল বাদ দিয়ে যদি কেউ নকল আমল আবিস্কার করে তার ঠিকানাও জাহান্নামে হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

كل بدعة ضلالة وكل ضلالة في النار-

সমস্ত নব আবিস্কৃত জিনিস বিদআত এবং সকল বিদআতী জাহান্নামী হবে। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে আসল ও প্রকৃত মিলাদ বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

প্রচলিত মিলাদ আবিস্কারকের হালাত

প্রচলিত মিলাদ আবিস্কারক ওমর বিন মহাম্মদ ইবনে দেহিয়া কোন মুজতাহিদ, মুহাদ্দিস বা ফকিহ কোনটাই ছিল না। ইলেম জ্ঞান ও সম্মানের দিক দিয়ে একজন সম্মান ও মর্যাদাহীন ব্যক্তি ছিল। তার পরিচিতি মূলত বাদশাহ আরবাল আবু সাঈদ কাউকারীর মাধ্যমেই হয়েছে। বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন ও মহা মনীষিগণ তাকে তীব্র ও কঠিন ভাষায় সমালোচনা করেছেন। আল্লামা তাজ উদ্দিন ফাকেহানী (রা.) যিনি মিলাদ আবিস্কারের যুগের একজন প্রখ্যাত আলেম ছিলেন। তিনি বলেন, প্রচলিত মিলাদ আবিস্কারক ওমর বিন মুহাম্মদ ইবনে দেহিয়া একজন ভ্রষ্ট ও চিত্ত পুজারী এবং পেট পুজারী ছিল। তারিখে মিলাদ- পৃষ্ঠা- ১৮

প্রচলিত মিলাদ সর্ব প্রথম বাদশাহ্ আরবাল ও ওমর বিন মুহাম্মদ ইবনে দেহিয়া আবিস্কার করেছে। তারা দুজনেই বিজ্ঞ আলিমদের নিকট অবিশ্বাস যোগ্য এবং অগ্রহণ যোগ্য ছিল। কারণ তারা উভয়েই গান-বাদ্য বাজাত। তাউযিহুল মারাম ফি বায়ানিল মাওলিদি ওয়ালকিয়াম- পৃষ্ঠা- ১৮

উল্লেখিত বর্ণনা থেকে জানা গেল, মিলাদ আবিস্কারক ওমর বিন মুহাম্মদ ইবনে দেহিয়া এবং বাদশা আরবাল আবু সাঈদ কাওকারী দুজনেই বিদআতি ছিল। যারা তাদের নিজের যুগের গ্রহণ যোগ্য উলামাদের নিকট অগ্রাহ্য ছিল, তাদের আবিস্কৃত আমল বর্তমান যুগে কিভাবে গ্রহণ যোগ্য হতে পারে। ব্যক্তি ভাল তো কাজ ভাল। আল্লাহ্ পাক আমাদের বিবেকের রুদ্ধদ্বার খুলে দিন। আমিন

কিয়ামের বিবরণ

ক্বিয়াম  قيامশব্দের আভিধানিক অর্থ দাঁড়ান। সামাজিকতার পরিভাষায় কোন সম্মানিত ব্যক্তির আগমনে দাঁড়ানকে কিয়াম বলে। আর মিলাদ পন্থীদের নিকট মিলাদ অনুষ্ঠানে বিশেষ ধরণের তাওয়াল্লুদ ও কাসিদা পাঠ করার পর রাসূলে আকরাম (সা.)  মিলাদ মাহফিলে হাজির হয়েছেন ধারণা করে অথবা ধারণা না করে তার সম্মানে ইয়ানবী সালাম আলাইকা বলার সময় দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রথাগত সালাম পাঠ করাকে ক্বিয়াম বলা হয়।

সামাজিকতায় ক্বিয়ামের হুকুম

কোন বুযুর্গ বা সম্মানিত ব্যক্তি যখন স্বশরীরে আগমন করেন, তখন কোন কোন মুহুর্তে কোন ধরণের বাড়াবাড়ী ছাড়া ক্বিয়াম করা (আগন্তকের সম্মানে দাঁড়িয়ে যাওয়া) বৈধ।  এ ব্যাপারে ইমাম নববী (রহ:)  قوموا الى سيدكم-

অর্থাৎ তোমরা তোমাদের নেতার কাছে গিয়ে দাঁড়াও। হাদিস দ্বারা প্রমাণ পেশ করেছেন। তবে এ বিষয়ে অন্যান্য উলামাগণের বিভিন্ন মতামত আছে। কিন্তু বিশেষ কথা হলো সম্মানিত ব্যক্তির স্বশরীরে আগমন, শায়খে কামেলের আগমন, পুত্রের সামনে স্বশরীরে পিতা-মাতার আগমন ও ছাত্রের সামনে ওস্তাদের আগমনে ইত্যাদিতে সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়ান মুবাহ পর্যায়ে জায়েজের পক্ষে কিছু উলামাগণ মতামত পেশ করেছেন। এ তো গেল সামাজিক ব্যাপার, শরয়ী কোন ব্যাপার নয়। কেননা উল্লেখিত সম্মানসূচক দাঁড়ানকে কেউ ইবাদত মনে করে না। কিন্তু যার জন্যে দাঁড়ান হচ্ছে সে যদি এটাকে গর্বের কারণ অথবা বড়ত্ব বোধ করে, এমন কি না দাঁড়ালে সে রাগান্বিত বা অসন্তুষ্ট হয় তার জন্য উহা মারাত্বক ক্ষতির কারণ হবে এতে কোন সন্দেহ নাই।

শরীয়তের দৃষ্টিতে ক্বিয়ামের বিধান

মিলাদ প্রসঙ্গে ক্বিয়াম দ্বারা বুঝান হয়, বিশেষ ধরণের কাসিদা বা তাওয়াল্লুদ পাঠ করার পর রাসূলে কারিম (সা.) মিলাদ মাহফিলে হাজির হয়েছেন একীন বা ধারণা করে অথবা ধারণা না করেই বা একীন না করেই ইয়ানবী বলে দাঁড়িয়ে প্রথাগত সালাম পাঠ করা। এ ধরণের কাসিদা বা তাওয়াল্লুদ পাঠ করা বা ইয়ানবী সালাম-আলাইকা বলে সালাম পাঠ করা, মাঝে মাঝে কবিতা পাঠকরা, মিলাদ মাহফিলে রাসূলে আকরাম (সা.) হাজির হওয়ার ধারণা রাখা বা ধারণা না রেখে সম্মানের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া, সম্মিলিত সুরে রেওয়াজগত সালাম পাঠকরা। এসব কিছুই নব আবিস্কৃত বিদআত।

কেননা মিলাদ মাহফিলে রাসূলে আকরাম (সা.) হাজির হওয়ার বিশ্বাস বা আক্বিদা রাখা শিরকের শামিল। বিধায় এ ধরণের বিশ্বাস তো করাই যাবে না।

শুধু ধারণা করে বা আবেগের সহিত কোন কাজ করা ইসলাম সমর্থন করে না। না দেখে দুর থেকে সম্মান প্রদর্শন করা বা সালাম দেওয়া এটা তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরণের সম্মান প্রদর্শন ও সালাম বিনিময় সামাজিকতার দৃষ্টিতেও অপছন্দীয়।

রাসূলে আকরাম (সা.) এর জীবদ্দশায় সাহাবাগণ দূর দেশে ইসলাম প্রচার ও জিহাদের জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু নবী করিম (সা.) এর শানে এ ধরণের না দেখে দূর দেশ থেকে ইয়ানবী বলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়ার নজীর কোন একজন সাহাবা থেকেও প্রমাণ নেই। অতঃপর তাবিঈন, তাবে তাবিঈন এবং আইয়িম্মায়ে মুজাতাহিদীন থেকেও এ ধরণের সালাম পেশ করার প্রমাণ নেই। বরং বিশ্বনবী (সা.) এর জীবদ্দশায় তার শানে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা তিনি নিষেধ করেছেন। যেমন-

عن ابى امامة قال خرج رسول الله صلى الله عليه وسلم  متكئا على عصا فقمنا له فقال لا تقوموا كما يقوم الاعاجم يعظم بعضها بعضا- مشكوة ٤٠٣

অর্থাৎ হযরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা রাসূলে করিম (সা.) লাঠিতে ভর করে বের হলেন, আমরা তাঁর সম্মানে তার জন্য দাঁড়িয়ে গেলাম। তখন তিনি বললেন অমুসলিম ও অনারারী লোকদের মত তোমরা দাঁড়াবে না। কারণ তারা এভাবে দাঁড়িয়ে একে অপরকে সম্মান প্রদর্শন করে। আবু দাউদ মিশকাত- পৃষ্ঠা- ৪০৩

عن انس رضـ قال لم يكن شخص احب اليهم من رسول الله (صـ) وكانوا اذا راوه لم يقوموا لما يعلمون من كراهيته لذالك-

অর্থ- হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, সাহাবায়ে কেরামের নিকট রাসূলে আকরাম (সা.) অপেক্ষা কোন ব্যক্তিই অধিক প্রিয় ছিল না। অথচ তাঁরা যখন তাকে দেখতেন তখন দাঁড়াতেন না। কেননা তাঁরা জানতেন যে তিনি এটা পছন্দ করেন না। (তিরমিযি, মিশকাত) পৃষ্ঠা- ৪০৩

উল্লেখিত দুই খানা সহীহ পর্যায়ের হাদিস। প্রথম হাদিস খানাতে রাসুলে আকরাম (সা.) ক্বিয়াম অর্থাৎ নিজের জন্য দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা সরাসরি ষ্পষ্ট ভাবে নিষেধ করেছেন।

প্রিয় পাঠকবৃন্দ চিন্তা করে দেখুন, যে কাজ নবী করিম (সা.) পছন্দ করেন নাই বরং নিষেধ করেছেন এমন কাজ যদি কেউ নবী প্রেমের দাবীদার হয়ে করে বসে, তাকে নবী প্রেমিক বলবেন, নাকি দুশমন বলবেন? বিষয়টি ভেবে দেখা প্রয়োজন। যে কিয়াম রাসূলে কারিম (সা.) এর হাজির হওয়া অবস্থায় নিষেধ হলো সেই ক্বিয়াম তার হাজির না থাকা অবস্থায় হাজার হাজার মাইল দুর থেকে কিভাবে জায়েজ হতে পারে। অবশ্যই না বলতে হবে।

দ্বিতীয় হাদিস দ্বারা ষ্পষ্ট প্রমাণ হয় যে, সাহাবায়েকেরামের নিকট রাসূলে কারিম (সা.) অপেক্ষা বেশী প্রিয় কোন ব্যক্তি ছিল না। এমন কি কিয়ামত পর্যন্ত সাহাবায়েকেরাম থেকে বেশী নবী প্রেমিক দুনিয়াতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। নবী করিম (সা.) কে নিজের স্ত্রী সন্তান, ঘরবাড়ী, মাল সম্পদ এমন কি দুনিয়ার সব কিছুর চেয়ে যারা ভাল বাসলেন, নবী (সা.) এর পদাংক অনুসরনই যাদের জীবনের পেশা ও নিশা ছিল। নবী করিম (সা.) এর কথা বা ইশারায় যারা জীবন দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি, তারা নবী (সা.) কে স্বচক্ষে দেখে ক্বিয়াম করল না। কেননা রাসূলে করিম (সা.) ক্বিয়াম বা দাঁড়ানকে অপছন্দ করতেন। আর রাসূলের অপছন্দনীয় কাজ সাহাবায়েকেরামদের পছন্দ হবে এটা তো হতেই পারে না। এটা শুধু পেট পুজারী স্বার্থপর অর্থলোভী মিথ্যা আশেকে রাসূল দাবীদারদের দ্বারাই সম্ভব হতে পারে। যারা উলামায়েছু নামে পরিচিত। আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করুন।

ক্বিয়ামের ইতিহাস

৭৫৫ হিজরীতে খাজা তকী উদ্দিন ছবকী মালেকী (রহ.) এর দরবারে জনৈক কবি হযরত রাসূলে আকরাম (সা.) এর শানে প্রশংসা কাব্য পাঠকালে খাজা সাহেব মাজযুব বা আল্লাহ্ ও তার রাসূল প্রেমে গভীর আসক্ত হওয়ার দরুন আবেগ অবস্থায় দাঁড়িয়ে যান। এটা কোন মিলাদ মাহফিল ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সুফিবাদ পন্থি মালেকী মাযহাবের সাধক ব্যক্তি। তার ব্যক্তিগত আবেগ পূর্ণ আসক্ত অবস্থার কোন আমল শরীয়তের দলিল হতে পারে না। আলবায়ানুল ফাছেল বাইনাল হক্কেওয়াল বাতিল-৮৫

কারণ-১   খাইরুল কুরুন বা সাহাবা, তাবিঈন, তাবে তাবিঈন তথা ইসলামী স্বর্ণ যুগ শরীয়তের সীমা নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। তাতে ক্বিয়ামের প্রমাণ নেই।

দ্বিতীয়- ক্বিয়াম একটা মালেকী মাযহাবের এক বুযুর্গের আমল, যা হানাফী, শাফী, হাম্বলী মাযহাবের জন্য দলিল হতে পারে না। যদি এ আমলটা আমল করার বিষয় হয় তাহলে মালেকী মাযহাব পন্থীদের জন্য তা বৈধ হতে পারে। অথচ মালেকী মাযহাবে ক্বিয়াম করার কোন প্রচলন নাই।

তৃতীয় : খাজা তকী উদ্দিন ছবকী (রহ.) জীবনে শুধু উক্ত আমল আবেগপূর্ণ ভাবে জীবনে একবারই করেছেন। দ্বিতীয় বার করার প্রমাণ তার জীবনে খুঁজে পাওয়া যায় না।

চতুর্থ : খাজা সাহেব একজন গভীর আবেগী ব্যক্তি ছিলেন। যার বিশেষ কোন আমল শরীয়তের বা অন্য কারো জন্য করণীয় দলিল হতে পারে না। কারণ প্রকৃত কোন আশেকে নবী বা নবী প্রেমিকের আবেগপূর্ণ কাজ অন্যের জন্য যদি করণীয় বা দলিল হতো, তাহলে হযরত ওয়ায়েজ কুরুনী (রহ.) এর ন্যায় সমস্ত দাঁত কেন উঠান হয় না। এটা কি গভীর আবেগের কাজ ছিল না? যার বিনিময়ে হযরত রাসুলে আকরাম (সা.) এর জুব্বা মুবারক অর্জিত হয়েছিল। এটা কি কোন মন্দ কাজ ছিল? তবে কোন স্বাভাবিক অবস্থার লোকের জন্য এটা বৈধ নয়। তেমনি ভাবে ক্বিয়াম একজন গভীর আবেগ পূর্ণ অস্বাভাবিক ব্যক্তির জীবনে একটি বারের জন্য জযবার হালাতে আমল ছিল যা স্বাভাবিক লোকের জন্য বৈধ বা করণীয় না।

প্রচলিত মিলাদ ও ক্বিয়ামের মাঝে দূরত্ব

প্রিয় পাঠকবৃন্দ প্রচলিত মিলাদের আবিস্কার হল ৬০৪ হিজরীতে। যা আবিস্কার করলেন ওমর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে দেহিয়া। আর ক্বিয়ামের আবিস্কারক তকী উদ্দিন ছবকী ৭৫৫ হিজরীতে। এখন দুটি বিষয়ই মিলিয়ে দেখা যাক বিষয় দুটির মধ্যে দূরত্ব কত। প্রচলিত মিলাদের আবিস্কারক ১৫১ বৎসর পূর্বে এবং প্রচলিত ক্বিয়ামের আবিস্কার ১৫১ বৎসর পরে। অতএব ১৫১ বৎসরের ব্যবধানের দুইটি নব আবিস্কৃত আমলকে একত্রিত করে খিচুরী মার্কা মিলাদ ও ক্বিয়াম বানানো হয়েছে। প্রচলিত মিলাদ ও ক্বিয়াম এ দুটি আমল এক সাথে উল্লেখিত দুজনের কারো থেকেই প্রমাণ নেই। আলবায়ানুল ফাসেল- ৮৭।

দ্রাসা শিক্ষা সিলেবাসে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়ামের আলোচনা নাই

আমাদের দেশে তথা ভারত উপমাহাদেশে দু ধারার মাদ্রাসা শিক্ষা প্রচলিত আছে। ১) কাওমী  ২) আলিয়া। উভয় শিক্ষা ব্যবস্থায়ই শিশু শ্রেণি থেকে কামিল/দাওরা এবং তাফসীর ইফতা ইত্যাদি তাকমিল পর্যন্ত পাঠ্য সূচীগুলি এমন ভাবে সাজানো হয়েছে, ঐ সকল পাঠ্য পুস্তকে শরীয়তের ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, নফল ও মুস্তাহাবসহ ইসলামের সকল বিষয় বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ওজু, গোসল, পাক-পবিত্র, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাতসহ দ্বীনের সকল আমলের নিয়ম পদ্ধতি বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু একজন ব্যক্তির আলেম হওয়ার জন্য দেশ-বিদেশে এমন কি আন্তর্জাতিক যে পাঠ্যসূচী রয়েছে তার মধ্যে কোথাও প্রচলিত মিলাদ ও কিয়ামের আলোচনা নাই। বিশ্বাস না হয়, যে কোন বড় আলেমকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন, হুজুর আপনি যে বড় আলেম হয়েছেন আপনার ইলম শিক্ষার পাঠ্য সূচীর কোন বই বা কিতাবে প্রচলিত মিলাদ ও কিয়ামের নিয়ম পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু পেয়েছেন কি? উত্তরে তিনি না-ই বলবেন। অতএব প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম যদি শরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ পূণ্যের কাজ হতো তাহলে একজন ব্যক্তিকে আলেম হতে গেলে তার এ বিষয় অবশ্যই পাঠদান করা হতো। অথচ শিশু শ্রেণি হতে তাকমিল পর্যন্ত ১৮ বৎসরের ধর্মীয় শিক্ষা সিলেবাসে বা পাঠ্য  তালিকায় কোন বই বা কিতাবে এ বিষয়ে কোন আলোচনা নেই। বুঝা গেল প্রচলিত মিলাদ ও কিয়াম ইসলামী কোন বিষয় নয়। বরং এটা ইসলামের নামে মনগড়া ভ্রান্ত নিয়ম পদ্ধতিতে নব আবিস্কৃত বিদআত ও নাজায়েজ।

বিদআত ও কুসংস্কার বিস্তারিত পড়ুন

গুগল ট্রান্সলেটর