হযরত ইদরিস (আ.) বেহেশতে গমন

হযরত ইদরিস (আ.) বেহেশতে গমন

হযরত ইদরীস (আঃ) জীবনে বহু মা‘জেযা প্রদর্শন করেছিলেন। তন্মধ্যে একটি প্রধান মা‘জেযা এই যে, তিনি যেসব ভবিষ্যদ্বণী করতেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবে পরিণত হত। তাঁর অত্যধিক ইবাদাতে আনন্দিত হয়ে বিভিন্ন সময়ে ফেরেশতাগণ তাঁকে আসমানে নিয়া যেতেন।

এই সম্পর্কিত একটি ঘটনা তাঁর জীবনের সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ঘটনারূপে পরিচিত। একদা তিনি তাসবীহ তাহলীল পাঠে রত ছিলেন। এমন সময়ে হঠাৎ ফেরেশতা আজ্রাইল (আঃ) জনৈক সাধারণ মানুষের বেশে এসে তাঁর সম্মুখে দন্ডায়মান হলেন। তিনি তাকে জনৈক বিদেশী মেহমান মনে করে যথোচিত অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করলেন।

হযরত ইদরীস সর্বদা রোযা রাখতেন এবং প্রত্যহ সন্ধ্যার পূর্বে তাঁর ইফতারের জন্য বেহেশত হতে খাবার আসত। তিনি সেই বেহেশতী খাবার দ্বারা ইফতার করতেন। ইফতার করে যা উদ্বৃত্ত থাকত তা আবার বেহেশতে ফিরে যেত। সেইদিনও বেহেশত হতে খাবার আসতে তিনি তাদ্বারা ইফতার করলেন এবং মেহমানকেও তা খেতে দিলেন। উক্ত মেহমানরূপী ফেরেশতা আজ্রাইল (আঃ) খানা খাইলেন না; বরং সারারাত্র ইবাদাতে অতিবাহিত করলেন।

মেহমান ব্যক্তির আচার-আচরণে আরও কতগুলি বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হইল, যা দেখে হযরত ইদরীস (আঃ) বিস্ময়বোধ করলেন। পরদিন ভোরবেলা হযরত ইদরীস (আঃ) মেহমানকে বললেন, ওহে আগন্তক মেহমান! চলুন আমরা একটু ভ্রমণ করে আল্লাহ তায়ালার কুদরতসমূহ অবলোকন করে আসি।

মেহমান তাতে সম্মত হয়ে দুইজন একত্রে ভ্রমণে বের হলেন, কিছুদূর গমন করে হঠাৎ মেহমান বললেন, চলুন, আমরা ঐ ক্ষেত হতে কিছু ফল তুলে এনে দুইজনে ভক্ষণ করি।

হযরত ইদরীস (আঃ) তাতে বেশ কিছুটা আশ্চর্য ও ক্ষোভ মিশ্রিত কন্ঠে বললেন, আপনি তো ভারী আশর্য মানুষ! রাত্রে আপনি হালাল খানা খেলেন না, অথচ এখন অপরের ক্ষেত হতে ফল তুলে খেতে চাইতেছেন। অন্যের মাল না বলে গ্রহণ করা আমাদের জন্য যে একেবারে নিষিদ্ধ। 

মেহমান তাঁর কথার কোন জবাব না দিয়া সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগলেন।

কিছুদূর সম্মুখে গমন করে একস্থানে কতকগুলি ছাগল চরতে দেখে মেহমান হযরত ইদরীস (আঃ)-কে বললেন, চলুন ওখান হতে একটা ছাগল এনে আমরা যবেহ করি। তা বেশ করে খাওয়া কার্য,তা কি আপনার জানা নেই?

ইদরীস (আঃ)- এ স্বেচ্ছায় মরণবরণ

এভাবে আগন্তুক ব্যক্তি তিনদিন পর্যন্ত হযরত ইদরীস (আঃ)-এর সাহচর্যে থাকলেন। তার আচরণাদি লক্ষ্য করে হযরত ইদরীস (আঃ)-এর মনে সন্দেহের উদ্রেক হল যে, এ ব্যক্তি নিশ্চয় কোন মনুর্ষ নহে। অতএব তিনি বললেন, আল্লাহর কসম আপনি আপনার প্রকৃত পরিচয়টা বলুন। মেহমান বললেন, আমি কোন মানুষ নহি। আমি একজন ফেরেশতা। আমার নাম মালাকুল-মওত আজ্রাঈল (আঃ)।

হযরত ইদরীস (আঃ) বললেন, আপনিই কি দুনিয়ার যাবতীয় প্রাণীর জান কবজ করে থাকেন? মালাকুল-মওত বললেন-হাঁ। তখন হযরত ইদরীস (আঃ) বললেন, তবে মনে হয় আপনি আমার জান কবজ করতে এসেছেন।

মালাকুল-মওত বললেন না, আপনার সহিত ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করতে এসেছি। আমার একান্ত বাসনা যে, আপনিও আমার এ প্রস্তাবে রাজী হবেন।

হযরত ইদরীস (আঃ) বললেন, আমি আপনার সাথে এ শর্তে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করতে পারি যে, আপনি আমাকে একবার মৃত্যুর অবস্থাটা উপভোগ করাবেন। যদি আপনি আমাকে এখনই একবারা মৃত্যুর অবস্থাটা উপভোগ করান, তা হলে আমার অনেকটা উপকার হত। মৃত্যুর ভয়ে আমি বেশি করে আল্লাহর ইবাদাতে রত হতে পারতাম।

মালাকুল-মওত বললেন, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তো আমি পারি না। যেহেতু এখন তো আপনার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয় নাই।

হযরত ইদরীস (আঃ) বললেন, আপনি আল্লাহর নিকট হতে অনুমতি গ্রহণ করে লউন। তখন মালাকুল-মওত আল্লাহর দরবারে অনুমতি প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ তাঁকে অনুমতি প্রদান করলেন। অনুমতি লাভ করে মালাকুল-মওত তাঁকে আবার জীবিত করে দিবার জন্য আল্লাহর দরবারে প্রর্থনা করলেন। আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা কবুল করে হযরত ইদরীস (আঃ)-কে জীবিত করে দিলেন। 

অতঃপর ফেরেশতা জিব্রাঈল (আঃ) তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ভাই ইদরীস (আঃ) বলুন তে জান কবজের অবস্থাটা আপনার নিকট কিরূপ মনে হয়েছিল?

হযরত ইদরীস (আঃ) জবাবে বললেন, ভাই মালাকুল-মওত! কোন জীবিত প্রাণীর শরীরের চামড়া মাথা হতে পা পর্যন্ত টানিয়া খসাইয়া ফেললে প্রাণীটির যেরূপ কষ্ট হয় আমার তদ্রূপ কষ্ট  অনুভূত হয়েছিল।

ফেরেশতা আজ্রাঈল বললেন, ভাই ইদরীস (আঃ) ! আমি আজ পর্যন্ত যত জান কবজ করেছি, এত সহজে কারও জান কবজ করি নাই। আপনার যাতে অল্প কষ্ট হয়, আমি সেদিকে খুবই লক্ষ্য রেখেছিলাম।

কৌশলে বেহেশত গমন

যা হউক অতঃপর ইদরীস (আঃ) বললেন, ভাই আজ্রাঈল! আমার মনে দোজখ দেখবার খুবই সাধ জেগেছে। যদি আপনি আমাকে দোজখ দেখাতেন, তবে দোজখের ভয়ে আমি ইবাদাত-বন্দেগীতে আরও বেশি মনোযোগী হতে পারতাম।

তাঁর প্রস্তাব মন্জুর করে মালাকুল-মওত তাঁকে দোজখের দরজা পর্যন্ত নিয়া গেলেন। তিনি দোজখ দেখবার পর বললেন, ভাই আজ্রাঈল (আঃ)! আমার মনে বেহেশত দেখারও অন্যন্ত আগ্রহ জেগেছে। যদি আপনি আমার এই সাধটি পূর্ণ করতেন, তবে আমি চিরকৃতজ্ঞ হয়ে থাকতাম।

মালাকুল-মওত বললেন,যদি আপনি আমার নিকট প্রতিশ্রুতি দেন যে, বেহেশত দেখেই আমার নিকট ফিরিয়া আসবেন, তা হলে আপনাকে বেহেশত দেখাতে পারি।

হযরত ইদরীস (আঃ) তাতে রাজী হলে আজ্রাঈল (আঃ) তাঁকে বেহেশতের দরজায় পৌছায়ে দিলেন। তিনি বেহেশতের দরজায় নিজের জুতা খুলে রেখে তার ভিতরে প্রবেশ করতঃ কিছুক্ষণ ঘুরা-ফিরা করলেন। তারপর ফিরে এসে নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন, কিন্তু আবার পরক্ষণেই জুতা পায় দিয়ে এক দৌড়ে বেহেশতের ভিতরে ঢুকে পড়লেন।

মালাকুল-মওত তাঁকে ডেকে বললেন, ভাই ইদরীস (আঃ)! আপনি আবার বেহেশতে ঢুকলেন কেন? তাড়াতাড়ি চলে আসুন । আমি আপনাকে দুনিয়ায় পৌঁছাইয়া দিয়া আমার অন্যান্য কাজে রত হবে।

হযরত ইদরীস (আঃ) বেহশতের ভিতর হতে জবাব দিলেন, ভাই মালাকুল-মওত ! আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, প্রত্যেক প্রাণীই একবার মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে এবং একবার দোজখ না দেখে কেউ বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না। আমি তো একবার মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করলাম এবং দোজখও দর্শন করলাম। তারপর বেহেশত হতে বের হয়ে আপনার সাথে আমার ওয়াদাও পালন করলাম। অতএব এখন আর আমি বেহেশত হতে বের হব না, আপনি এবার আপনার কাজে চলে যান।

ফেরেশতা আজ্রাঈল (আঃ) হযরত ইদরীস (আঃ) হযরত ইদরীস (আঃ)- এর কথা শুনে কর্তব্য স্থির করতে না পারে দাঁড়াইয়া রইলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আজ্রাঈলকে লক্ষ করে বললেন, আজ্রাঈল! ইদরীসকে বেহেশতেই থাকতে দাও। তার অদৃষ্টে আমি এইরূপ ঘটনাই লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলাম। অতঃপর হযরত ইদরীস (আঃ) মহা সুখে বসবাস করতে লাগলেন। এদিকে কিন্তু তাঁর পরিবারবর্গ তাঁর বিচ্ছেদে কাঁদিয়া দিন কাটাতে লাগিল। 

ইবলীসের ছলনা

কিছুদিন পরে পাপিষ্ঠ ইবলীস একদিন হযরত ইদরীস  (আঃ)- এর সন্তান-সন্তানির কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, তোমাদের পিতার জন্য এভাবে দিবারাত্র ক্রন্দন করে কি লাভ হবে? আমি তোমাদের পিতার জনৈক ভক্ত উম্মত। তাঁর সমস্ত উম্মতের মধ্যে আমিই ছিলাম তাঁর সর্বাধিক প্রিয় ও স্নেহের পাত্র। তিনি জীবিত থাকাকালেই তাঁর অবিকল আকৃতির একটি প্রস্তরমূর্তি তৈরী করে আমার নিকট দিয়া বলে গেছেন যে, আমার বেহেশত গমনের পর তোমরা সকলে আমার এই মুর্তিকেই ভক্তি- শ্রদ্ধা করবে এবং তার চারিদিকে ঘুরে তাকে তাওয়াফ করবে। অনবরত তার পূজা-অর্চনা করবে। তা হলে আমি তোমাদের প্রতি অন্যন্ত সন্তুষ্ট থাকবে এবং তোমাদের প্রত্যেকের কল্যাণের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করব।

পাপিষ্ঠ ইবলীসের ছলনায় হযরত ইদরীস (আঃ)- এর সন্তানগণ ভুলে গেল এবং তারা ঐ মূর্তিটিকে একটি পাহাড়ের উপর স্থাপন করতঃ তার পূজা ও তাওয়াফ প্রভৃতি করতে শুরু করল। ঐ মূর্তিটা হুবহু ইদরীস (আঃ)- এর মতই ছিল। যে লোক তা অবলোকন করত, সে-ই মনে কতি যে, হযরত ইদরীস (আঃ)- ই পাহাড়ের উপর উপবিষ্ট আছেন।

ইবলীস হযরত ইদরীস (আঃ)-এর সন্তানদের হাতে মূর্তিটা দিয়াই তার কর্তব্য শেষ করল না। সে ঐ মূর্তি সম্পর্কে যে কথা হযরত ইদরীস (আঃ)-এর সন্তানদের কাছে বলেছিল সেই কথা সারা দেশে ঘুরে ঘুরে প্রচার করতে লাগল। ফলে দেশের সকলেই এসে হযরত ইদরীস (আঃ) এর মূর্তির পূজা করতে আরম্ভ করল।

ক্রমে অবস্থা এই দাঁড়াইল যে, হযরত ইদরীস (আঃ)-এর প্রচারিত সত্য ধর্মের রীতিনীতি সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত হয়ে মূর্তি পূজার ব্যাপক প্রসার লাভ করল। সকলেই তাকে প্রকৃত ধর্মরীতি বলে মনে করতে লাগল।

তথ্য কণিকাঃ

(সূরা মারয়ামঃ আয়াত৫৬-৫৭ সূরা আম্বিয়াঃ আয়াঃ ৫৬-৫৭ও ৮৫)

গোপন মাসাআলা

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Spread the love

Leave a Comment