হযরত হূদ (আ.) এর জীবনী

হযরত হূদ (আ.) এর জীবনী

বিষয় সংকেতঃ(১) কুরআনে হযরত হূদ (আ) এর উল্লেখ, (২) আদ জাতি (৩) আদের যুগ (৪) আদের দীন (৫) হযরত হূদ (আ,) (৬) হযরত হূদের ওফাত (৭) কিছু শিক্ষণীয় বিষয়। (৮) তথ্য কণিকা।

আদ জাতি

কুরআনের ৯টি সূরায় আদ জাতির বর্ণনা রয়েছে। সূরাগুলো হচ্ছে, আরাফ, হূদ, মুমিনুন, শুআ‘রা, ফুসসিলাত, আহাকাফ, আযযারিয়াত আল কামর এবং আল হাক্কাহ।

প্রসঙ্গ উল্লেখ্য, কুরআন ছাড়া অপর কোন আসমানী বা ঐতিহাসিক গ্রন্থ আদ জাতির উপর আলোকপাত করেনি। অতএব তাদের অবস্থা একমাত্র কুরআন শরীফ কিংবা ধ্বংসাবশেষ প্রাপ্ত নিদর্শনের মাধ্যমেই উদ্ধার করা যেতে পারে।

প্রথম মাধ্যমটি নিশ্চিত ও একান্ত নির্ভরযোগ্য। তাই এতে বর্ণিত তথ্যাদি সন্দেহাতীত। আর দ্বিতীয় মাধ্যমটি বুদ্ধি-নির্ভর ও অনুমান ভিত্তিক। তাই স্বাভাবিক ভাবেই হাতে প্রাপ্ত তথ্যাদিও চূড়ান্ত বা সন্দেহাতীত নয়।

আদ আরবের একটি প্রাচীন কওম অথবা সামিয়া (সেমেটিক জাতির অন্তর্গত একটি অতি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠির নাম।

প্রাচীন ইতিহাসের কোন কোন ইউরোপীয় গ্রন্থকার আদ জাতির ইতহাসকে একটি নিছক পৌরাণিক কাহিনী বলে ধারণা করেন। কিন্তু তাদের ধারণা একেবারে ভিত্তিহীন। কেননা অত্যাধুনিক গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে আরবের প্রাচীন অধিবাসীরাও জনবল ও ধনবলের দিক দিয়ে একটি অতি প্রভাবশালী জনগোষ্ঠির মর্যাদায় উন্নীত হয়েছিল। এরাই পরবর্তী কালে আরব থেকে বের হয়ে সিরিয়া, মিসর ও ব্যবিলনে গিয়ে এক একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এখানে পার্থক্য শুধু এই আরবরা ঐ সব অধিবাসীকে উমামে বায়িদাহ (ধ্বংসপ্রাপ্ত মানবগোষ্ঠী) বা আরবে আরিবাহ (বিশুদ্ধ আরব) নামে এবং এদের বিভিন্ন উপদলকে আদ সামুদ ত্বাসাম এবং জাদীস নামে অভিহিত করে থাকে।

আর প্রাচ্যের ঐতিহাসিকরা তাদের গ্রন্থে সামিয়া সেমেটিক মানবগোষ্ঠী নামে এদের বর্ণনা করে থাকেন। অতএব এ পার্থক্য মূল ঘটনায় নয় বরং শুধু শব্দের প্রয়োগ-প্রদ্ধতিতে। সম্ভবতঃ একারণেই পবিত্র কুরআন এদেরকে আদে উলা (প্রথম আদ জনগোষ্ঠী) বলেছে, যাতে স্পষ্ট বুঝা যায় বনুসাম ও আদে উলা, আরবের প্রাচীন একই মানবগোষ্ঠীর দুটি ভিন্ন নাম মাত্র।

ভৌগলিকদের ধারণা মতে, আরব শব্দ মূলত আরাবাহ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ মরু প্রান্তর বা গ্রামাঞ্চল। স্বয়ং আরবী ভাষায়ও গ্রামবাসীকে আরব এবং গ্রাম্যকে আরাবাহ বলা হয়। কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণা মতে আরব শব্দ গরব থেকে উদ্ভূত। ঐ সব আরাম বা সামিয়া মানবগোষ্ঠী যারা ফুরাতে গরবীতে (ফুরাত নদীর পশ্চিমাঞ্চলে) বসবাস করত প্রথমে গরব অতপর (তার অপভ্রংশ) আরব নামে পরিচিত অর্জন করে।

তাদেরকে আরব নামকরণের কারণ যাই হোক না কেন এটা একটি বাস্তবসম্মত ব্যাপার এ অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন সামিয়া মানবগোষ্ঠী অথবা আদ জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল। এ কারণেই আদ‘রা যে খাঁটি আরব মানবগোষ্ঠী তাতে কোন মতবিরোধ নেই। উপরন্তু আদ কোন অনারব ভাষার নয়, বরং আরবী ভাষারই শব্দ, ইবরানীতে যার অর্থ সুউচ্চ ও বিখ্যাত। পবিত্র কুরআনে আদ এর সাথে ইরম শব্দেও যুক্ত রয়েছে। আর ইরাম (সাম) এর অর্থ ওসুউচ্চ ও বিখ্যাত ছাড়া কিছু নয়। অবশ্য এই আদকেই তাওরাতের ভ্রান্ত অনুকরণে কোথাও কোথাও আমালিকা বলা হয়েছে।

আদের যুগ

আদের যুগ খ্রীষ্ঠঃ পূঃ দুহাজার অব্দ বলে ধারণা করা হয়। পবিত্র কুরআনে আদকে নূহের জাতির পরবর্তী জাতি, আখ্যা দিয়ে মূলতঃ নূহের জাতির উত্তরাধিকারী হিসাবেই তাদেরকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ থেকেও প্রমাণিত হয় সিরিয়া পুনরায় আবাদ হওয়ার পর আদ থেকেই সামিয়াহ জনগোষ্ঠীর উন্নতির সূচনা হয়।

আদের আবাস্থল

আরদে আহকাফ ছিল আদের মূল আবাসস্থল। এটা হাদরামাউতের উত্তরে, আম্মানের পশ্চিমে এবং রবউল খালীর দক্ষিণে অবস্থিত। কিন্তু আজ সেখানে বালুর ছোট বড় টিলা ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হয় না। (১) কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, আরবের হাদরামাউত, ইয়েমেন এবং পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে ইরাক পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভূখন্ড ছিল আদ মানবগোষ্ঠীর আবাসভূমি, আর ইয়েমেরন ছিল তার রাজধাণী।

আদের দীন

আ‘দরা ছিল পৌওলিক। তাদের পূর্ববতীকে নূহের কওরেম ন্যায় এরাও ছিল মূর্তি পূজারী এবং মূর্তি নির্মাণে পারদর্শী।পৌরাণিক ইতিহাসের কোন কোন বিশেষজ্ঞের ধারণে মতে, নূহের কওরেম মত এদেরও পূজ্যদেবতার নাম ছিল ওয়াদ্দ, সূআ‘ইয়াগুস, ইয়াউক ও নাসার।

হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে আদ জাতির একটি দেবতার নাম ছিল সামূদ এবং অপর একটির নাম ছিল হাতার।

হযরত হূদ (আ)

আদ কওরেম তাদের রাজনৈতিক ঐশ্বর্য ও পরাক্রম এবং দৈহিক ও সামরিক শক্তির দাম্ভিকতায় এমনি মও হয়ে উঠেছিল আল্লাহর সত্তা ও একত্বের কথা তাদের অন্তর থেকৈ একেবারে মুছে গিয়েছিল। তারা নিজেদের হাতে গড়া মুর্তিকে পূজ্য দেবতা বানিয়ে নিঃশব্দচিত্তে সর্বপ্রকার দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়। তখন আল্লাহতাআলা হূদ (আ) কে তাদের মধ্যে নবী করে প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন আদ কওরেম সব চেয়ে সম্ভ্রান্ত, শাখা খালূদ এর সন্তান। সুদৃশ্য চেহারার অধিকারী এ নবীর গায়ের রং ছিল রাল –সাদা মিশ্রিত এবং দাড়ি ছিল খুব বড়।

ইসলাম প্রচার

হূদ (আঃ আদ কওমকে আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস ও তার ইবাদতে প্রতি আহবান জানান এবং মানবের উপর অত্যাচার করা থেকে তাদেরকে বারণ করেন। কিন্তু তারা তাঁর কথায় কান দিল না বরং অত্যন্ত নির্লজ্জ ভাবে তার প্রতি মিথ্যা আরোপ করতে লাগলো। তারা দম্ভভরে ঘোষণা করলো; কে আমাদের চেয়ে অধিক শক্তি শালী? কিন্তু হূদ (আ) অনবরতঃ তাদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করতে থাকেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহর আযাবের ভয় দেখান এবং দাম্ভিকতা ও অবাধ্যতার কুফল বর্ণনা করে তাদেরকে নূহের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি তাদের সম্বোধন করে বলেন, হে আমার কওম নিজেদের দৈহিক শক্তি ও রাজূনৈতিক পরাক্রমের উপর তোমরা দম্ভ করো না, বরং আল্লাহর শোকর আদায় কর্ এজন্য তিনি তোমাদেরকে এই প্রাচুর্য প্রদান করেছেন, নূহের জাতি ধ্বংস প্রাপ্ত হওয়ার পর তোমাদরকে ভূমির অধিকারী করেছেন এবং তোমাদের আয়েশ আরাম ও সুখ শান্তি ব্যবস্থা করেছেন।অতএব তার নিয়ামত ও অবদানসমূহের কথা ভুলে যেয়ো ন এবং মানুষের গড়া এ সব মূর্তির উপাসনা থেকে বিরত হও। কেননা এর না তোমাদের কোন উপকার করতে পারবে, আর না অপকার জীবন মৃত্যু, লাভক্ষতি সবই আল্লাহর হাতে। হে আমার কওম এটা সত্য যে তোমরা দীর্ঘদিন যাবত আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত রয়েছ। কিন্তু এখানে যদি তোমরা তওবা বা অনশোচনা কর এবং দুষ্ককর্ম থেকে বিরত হও তবে তার করুণা ও রহমত এ প্রশস্ত তিনি তোমাদের মাফ করে দেবেন।তোমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তন কর- তিনি তোমাদের গ্রহণ করবেন। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, পবিত্র জীবন অধিাকর কর-তিনি তোমারেদ দ্বিগুণ ত্রিগুণ উন্নতি প্রদান করবেন। তোমাদেরকে আরো বেশি সম্মানিত করবেন এবং তোমাদের মর্তবা ও প্রতিপত্তি আরো বৃদ্ধি করে দেবেন।

হযরত নূদ (আ) ইসলাম প্রচারের সময় বার বার একথাটি পুনরাবৃত্তি করতেন আমি তোমাদের কাছ থেকে এর (তাবলীগের) কোন প্রতিদান চাই না। কেননা আমার প্রতিদান আল্লাহর হাতে রয়েছে।– প্রকৃত পক্ষে এটাই নবী রসূলদের বৈশিষ্ঠ্য তাদেরকে কখনো কেউ এ দুর্নাম দিতে পারেনি, যে তারা মানুষের কাছ থেকে কোন ধন সম্পদ বা সম্মান মর্তবার প্রত্যাশা করেন। কেননা তাদের জীবনের লক্ষ্য একটিই। আর তাহলো, দাসদের কাছে তাদের স্রষ্টা ও পালনকর্তা আল্লাহ তাআলার হুকুম যথাযথভাবে পৌছিয়ে দেওয়া।

আদ কওমের মাত্র কয়েকজন ছিল ইমানদার। অবশিষ্ট সবাই ছিল কাফির, অবাধ্য ও পথভ্রষ্ট। হযরত হূদের উপদেশাবলি তাদের কাছে খুবই বিরক্তিকর ঠেকাত। তারা পছন্দ করত না তাদের ধ্যানধারণা, আকায়েদ-আচারণ ও চালচনের ব্যাপারে পথ নির্দেশ করুক। শেষ পর্যন্ত তারা হযরত হুদকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ শুরু করে দিল। তারা তাঁর আন্তরিকতা, মানবপ্রেম, নিষ্কলুষ ব্যবহার এবং সত্যের পক্ষে শেষকৃত যাবতীয় প্রমাণ উপেক্ষা করল এবং তাকে মিথ্যাবাদী আখ্যা দিল। তারা তাঁকে বললো, আমরা এমন নই তোমাকে আল্লাহর রসূল বলে মেনে নেব এবং আমাদের পূজ্য দেবতাদের পূজা অর্চনা এ বিশ্বাসে ছেড়ে দেব ওরা আল্লাহর সম্মুখে আমাদের জন্য সুপরিশকারী হবে না।

হযরত হূদ তখন বললেন, আমি আহমকও নই, পাগল নই, বরং নিশ্চিতভাবে আল্লাহর রসূল আল্লাহ তার দাসদের হেদায়েতের জন্য কোন আহমককে মনোনীত করেন না, যাতে সে মানুষের উপকারের পবিবতর্তে অপকার করে বসে এবং পথ প্রদর্শনের পরিবর্তে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে দেয়। বরং এই বিরাট দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি আপন দাসদের মধ্যে থেকে এমন ব্যক্তিকে মনোনীত করেন যে সব দিক দিয়ে একাজের জন্য যোগ্য এবং তার উপর অর্পিথ দায়িত্ব সম্পাদনে সম্পূর্ণ সক্ষম। আল্লাহ রিসালাতের দায়িত্ব কার উপর অর্পন করবেন তা তিনি ভালভাবেই অবগত। (সূরাঃ আল আনআম, আয়াতঃ১২৪)

কিন্তু আদ জাতির অবাধ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকলো। কোন দলীল প্রমাণ বা আদেশ উপদেশই তাদেরকে প্রভাবিত করতে পারল না। তারা হূদকে অপমাণিত ও লাঞ্ছিত করার কাজে পূর্বের চেয়ে আরো বেশি তৎপর হলো। তারা তাঁকে উন্মাদ ও পাগল সাব্যস্ত করে উপহাস করতে লাগলো। তারা বলতে লাগলো, হে হূদ আমরা লক্ষ্য করছি তুমি যখন থেকে  আমোদের পূজ্য দেবতাদরে কুৎসারটাতে আরম্ভ করেছ এবং তাদের পূজা- অর্চনা থেকে আমাদের নিরস্ত করছ ঠিক তখন তেকেই তোমার অবস্থা শোচনীয় হতে চলেছে এবং এখন তুমি একজন বদ্ধ উন্মাদ।

তারা এইসব অশিষ্ট কথাবার্তা বলে এবং অনবরত হযরত হূদের দূর্নাম রটনা করে ভাততে থাকে এখন কোন ব্যক্তিই আর হযরত হূদের দিকে ফিরে দৃষ্টি দিবে না এবং তাঁর কোন কথাই শুনবে না। হযরত হূদ অধিক সবরের সাথে তাদের কথাবার্তা শুনলেন। অতপর প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন,

আমি আল্লাহকে এবং তোমাদের সবাইকে সাক্ষী রেখে ঘোষণা করছি আমি আদৌ বিশ্বাস করি না এ সব মূর্তির এমন কোন ক্ষমতা রয়েছে যার দ্বারা আমার কিংবা অপর কোন মানবের কোনরূপ ক্ষতি করতে পারে। অতপর আমি তোমাদেরকে এবং তোমাদের এ বাতিল দেবতাদেরকে চ্যালেন্জ দিচ্ছি। যদি তাদের মধ্যে সত্যি সত্যি এধরনের কোন ক্ষমতা রাখে তবে তারা যেন অবিলম্বে তা প্রায়াগ করে। আমি আল্লাহর ফজলে বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা ও বিচার শক্তির অধিকারী। আমি শুধু সেই আল্লাহর উপর ভরসা করি যার হাতে সমগ্র বিশ্বের চাবিকাঠি রয়েছে এবং যিনি সব প্রাণীর জীবন মৃত্যুর মালিক। তিনি নিশ্চয়ই আমাকে মদদ করবেন এবং সকল অপকারীর অপকার থেকে আমাকে হেফাজত করবেন।

অবশেষে হযরত হূদ (আ) তাদের অনবরত বিদ্রোহ ও জোরজবরদস্তি বিরুদ্ধে ঘোষণা করেনঃ যদি আদ জাতির, সত্যের বিরুদ্ধাচরণের এই অভ্যাসের কোন পরিবর্তন না আসে এবং তারা যদি আমার নির্দেশ, উপদেশ মনোযোগ সহকারে না শোনা তবেও আমি আমার উপর অর্পিত (ইসলাম প্রচারের) দায়িথ্ব যথাযথভাবে পালন করে যাব এবং এতে মোটে ধৈর্যহারা হব না, তবু (এই জোরজবরদস্তি কারণে) এদের ধ্বংস অনিবার্য। আল্লাহ তাআলা শিগগীর এদেরকে ধ্বংস করে দেবেন এবং এদের স্থলে নতুন আর একটি মানব দলকে পৃথিবীর উত্তরাধিকারী করবেন। আর এতে কোন সন্দেহ নেই ওরা আল্লাহ তাআলার অনুপরিমাণ ক্ষতিও করতে পারবে না কেননা তিনি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। একমাত্র তিনিই সমগ্র সৃষ্টির রক্ষা কর্তা ও ত্রাণকর্তা। সবকিছুই তার অধীন এবং অনুগত।

হে আমার কওম, এখানে তোমরা বিবেক বুদ্ধি খাটিয়ে কাজ কর, নূহের জাতির দূরবস্থা থেকে শিক্ষা গ্রহণ কর এবং আল্লাহর বাণীর (আহবানের) সামনে মাথা অবনত কর। অন্যথায় তোমাদের দুর্দিন ঘনিয়ে আসছে। শিগগীর তোমাদের সব দর্পচূর্ণ হয়ে যাবে। তখন তোমাদের অনুশোচনা কোন কাজেই আসবে না।

হযরত হুদ বার বার তাদেরকে একথাও বললেন, আমি তোমাদের দুশমন নই বরং বন্ধু। আমি তোমাদের কাছ থেকে ধন সম্পদ বা রাজত্ব চাই না, বরং চাই তোমাদের নাজাত। আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌছার ব্যাপারে অভিশ্ব হতে পারি না। আমি তোমাদের কাছে তাই বলি, যা আমাকে বলে দেয়া হয়। আমি যা কিছু বলি তা কওরেম বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তথা চিরস্থায়ী শাস্তি ও মঙ্গলের জন্য বলি।

নিজের কওম ও সম্প্রাদায়ের একজন ব্যক্তির উপর আল্লাহর বাণী নাযিল হয়েছে এতে তোমাদের আশ্চর্যান্বিত হবার কি আছে? এটা তো আল্লাহ তাআলারই চিরন্তন নিয়ম তিনি মানুষের হেদায়েত ও পথ প্রদর্শনের জন্য তাদেরই মধ্য থেকে একজন ব্যক্তিকে রসূল হিসাবে মনোনীত করেন এবং তাঁরই মাধ্যমে স্বীয় ইচ্ছা ও অনিচ্ছা এবং সন্তষ্টি ও অসন্তষ্টির কথা মানব জাতিকে জানিয়ে দেন। আর প্রকৃতির ও চাহিদা এই কোন কওম বা মানবগোষ্ঠির পথ প্রদর্শক সেই ব্যক্তিই হবে যার কথাবার্তা তাদেরই অনুরূপ, যে তাদের আচার আচরণ ও স্বভাব-চরিত্র সম্পর্কে জ্ঞাত এবং যে তাদের সাথে রাতদিন চলাফেরা করে।

এরূপ হলে পর সে স্বাভাবিকভাবেই তাদের দোষত্রুটি ভালভাবে বুঝতে পারবে এবং সে অনুযায়ী যথাযথভাবে, তাদের পথও প্রদর্শন করবে।

আদ জাতি হূদের এ ঘোষণা শুনে বিম্মিত হলো। এবং আল্লাহর উপাসনা বলতে কি বুঝায় তা তাদের বোধগম্য হলো না। তারা যারপর নেই ক্রোধান্বিত হয়ে বললো, আমরা কি করে মূর্তি পূজার সে রীতির পরিত্যাগ করতে পারি যা বংশ-পরস্পরা আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছে? এটা তো আমাদের ও আমাদের বাপ দাদার জন্য একটা অপমান ছাড়া কিছু নয়। এই মূর্তিসমূহ আল্লাহর দরবারে আমাদের সুপারিশকারী-এ কথা বিশ্বাস করার জন্য কেন আমাদেরকে কাফির (অবিশ্বাসী) ও মুশরিক (অংশীবাদী) বলা হবে?

শেষ পর্যন্ত তারা রোষানলে একেবারে জ্বলে উঠলো এবং হূদকে চ্যালেন্জ দিয়ে ঘোষণা করল হে হূদ তুমি তো আমাদেরকে তোমার আল্লাহর তরফ থেকে ভীতি প্রদর্শন করছ এই বলে, আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি মহা দিবসের আযাব। (সূরাঃআস, আয়াতঃ১৩৫)

তবে হে হুদ, দিনের পর দিন এভাবে আমরা আর তোমার উপদেশ শুনতে পারব না, বরং তুমি এক কাজ কর-যদি তুমি সত্যি সত্যি নবী হয়ে থেক এবং তোমার কথাও সত্য হয়ে থাকে তবে তুমি সেই আযাব বরং নিয়ে এস, একসাথে সব ল্যাঠা মিটে যাবে। যদি তুমি সত্যবাদী হয়ে থাক তবে আমাদেরকে যার ডর দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস।(সূরাঃআল-আরাফ, আয়াতঃ৭০)

হযরত হূদ (আ) উত্তর দিলেন, যদি আমার আন্তরিক ও বন্ধু সুলভ উপদেশের এই উত্তর হয়ে তবে জেনে রেখ, সে শাস্তি আসতে আর বিলম্ব নেই। তোমাদের প্রভু শাস্তি ও ক্রোধ তো তোমাদের উপর নির্ধারিত হয়েই আছে।

তোমাদের কি বিবেক বাধে না তোমরা নিজেদের হাতে মূর্তি গড়ে তার কাছেই আবার সাহায্য প্রার্থনা করছ এবং কোন রূপ প্রমাণ ছাড়াই তাকে আল্লাহর সুপারিশকারী মনে করছ? আর আমি যুক্তিপ্রমাণ সহকারে উপদেশ দেয়া সত্ত্বেও তোমরা তা মানছ না,বরং উল্টো আল্লাহর শাস্তিই কামনা করছ? এ যদি তোমাদের শেষ বক্তব্য তবে অপেক্ষা কর। আমিও অপেক্ষা করছি সে দিবসের যা আসতে আর দেরি নেই।

তবে কি তোমরা আমার সাথে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কত নাম সম্বন্ধে যা তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা সৃষ্টি করেছ এবং সম্বন্ধে আল্লাহর কোন সনদ প্রেরণ করেননি? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।(সূরাঃআল-আরাফ, আয়াত ঃ৭১)

মোট কথা, আদে জাতীর সীমাহীন অবাধ্যতা ও জোরজবরদস্তি এবং আল্লাহর নবীর প্রতি চরম অবজ্ঞা ও দুশমনির পরিণাম স্বরূপ সেই আযাবে দিন ঘনিয়ে এল। প্রথমে দেখা দিল অনাবৃষ্টি। তারা ঘাবড়ে গেল তাদের চোখমুখে ফুটে উঠলো নৈরাশ্য। তাদের এই অবস্থা লক্ষ্য করে হূদ (আ)-এর হৃদয় গলে গেলো। নিরাশ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আর একবার তাদেরকে বুঝিয়ে বললেন,তোমরা সৎপথ অবলম্বন কর, আমার কথায় ঈমান আন। ইহকাল-পরকালে এটাই একমাত্র নাজাতের পথ। অন্যথায় আক্ষেপ করবে, কিন্তু সে আক্ষেপ কোন কাজেই আসবে না।

কিন্তু হতভাগার হুদের এ শেষ নসীহতও গ্রহণ করল না। তাদের অবাধ্যতা একেবারে চরমে গিয়ে পৌছলো। তাই চরম আযাব ও তাদের উপর আপাতিত হলো। একাধারে আটদিন এবং সাতরাত প্রবল ঝঞ্জাবার্তা প্রবাহিত হলো এবং তা তাদেরকে এবং তাদের বসত-বাটিকে একেবারে লন্ড ভন্ড করে দিল। সুস্থ সবল দানবতুল্য মানব, যারা ধরাকে সরা জ্ঞান করত তাদের দেহ ধরা পৃষ্ঠে এমনভাবে প্রড় রইল যেমন প্রবল ঝড় তুফানের আঘাতে অসাড় ও ছিন্ন ভিন্ন হয়ে পড়ে থাকে ডালপালা যুক্ত বড় বড় বৃক্ষবাজি।

যাহোক, ধরা পৃষ্ঠ থেকে আদ জাতিকে একেবারে ধ্বংস করে দেয়া হল, যাতে ভবিষ্যত বংশধরেরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। পারলৌকিক সে অভিশাপ ও আযাব তাদের উপর নেমে এলো তারা ছিল যার যোগ্যূ।

আল্লাহতাআলা হযরত হূদ (আ) এবং ইসলামের খাঁটি অনুসারীদেরকে ঐ আযাব থেকে হেফাজত করলেন। তারা রক্ষা পেল সীমালংঘনকারী দুরাচারীদের অত্যাচার নির্যাতন থেকেও।

মোটামুটি এ হলো আদে উলার (প্রথম আদ জাতির) শিক্ষণীয় ঘটনা- যা থেকে চক্ষুষ্মাণ ব্যক্তি মাত্রই উপদেশ গ্রহণ করতে পারে। এই ঘটনা মানবকে আল্লাহর আনুগত্যও তাকওয়ার দিকে আহবান জানায়, নিরস্ত করে অবাধ্যতা, সীমালংঘন ও খোদা দ্রোহিতা থেকে, সাবধান করে পাপের অশুভ পরিণাম থেকে এবং বিরত রাখে দাম্ভিকতা ও যতেচ্ছাচার থেকে।

পবিত্র কুরআন বিশদভাবে এবং অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপরোক্ত ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। যেমনঃ আদ কওমের কাছে তাদরে ভ্রাতাকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। তোমরা কি সাবধান হবে না?

তার কওরেম প্রধানরা, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, তারা বলেছিল আমরা তো দেখছি তুমি একজন নির্বোধ নই, (কেননা) আমি আমার প্রভু বাণী তোমাদের কাছে পৌছাচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা।

তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছ তোমাদের কাছে তোমাদেরই একজনের মাধ্যমে তোমাদের প্রভুর কাছ থেকে তোমাদেরকে সতর্ক করার জন্য উপদেশ এসেছে? এবং স্মরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে নূহের কওমের পরে তাদের স্থলাভিষিত্তক্ত করেছেন এবং তোমাদের আবার অপর ব্যক্তির অপেক্ষা শক্তিতে অধিকতর সমৃদ্ধ করেছেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, হযরত তোমরা সফলকাম হবে।

তরা বললো, তুমি কি আমাদের কাছে এই উদ্দেশ্যে এসেছ আমরা যেন শুধু আল্লাহ ইবাদত করি এবং আমাদের পূর্বপুরুষরা যার ইবাদত করত তা বর্জন করি? সুতরাং তুমি সত্যবাদী  হলে আমাদেরকে যার ডর দেখাচ্ছে তা নিয়ে এস।

সে বললো, তোমাদের প্রভু আযাব ও ক্রোধ তো তোমাদের উপর নির্ধারিত হয়েই আছে তবে কি তোমরা আমার সাথে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কত নাম সম্বন্ধে যা তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষেরা সৃষ্টি করেছে এবং যে সম্বন্ধে আল্লাহ কোন সনদ প্রেরণ করেন নি? সুতরাং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতিক্ষা করছি।

অতপর তাকে তার সংগীদেরকে আমার অনুগ্রহে উদ্ধার করেছিলাম আর আমার নিদর্শনকে যারা প্রত্যাখান করেছিল এবং যারা ঈমানদার ছিল না তাদেরকে ধ্বংস করেছিলাম।(সূরাঃ আল-আরাফ, আয়াতঃ৬৫-৭২)

আদ জাতির কাছে তাদের ভ্রাতা হূদকে প্রেরণ করে ছিলাম । সে বলেছিল, হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ছাড়া অপর কোন ইলাহ নেই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা রচনাকারী। হে আমার কওম, আমি এর পরিবর্তে তোমাদের শ্রমফল যাঞ্ঝা করি না। আমার শ্রমফল আছে তাঁর কাছে ‍যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। তোমরা কি অনধাবন করবে না? হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের প্রভু কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, অতপর তাঁর দিকে  প্রত্যাবর্তন কর। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বারি বর্ষাবেন। তিনি তোমাদেরকে আরো শক্তি দিয়ে তোমাদের শক্তি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমরা অপরাধী হয়ে মূখ ফিরিয়ে নিও না।

ওরা বললো, হে হূদ তুমি আমাদের কাছে কোন স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসনি, তোমার কথায় আমরা আমাদের ইলাহদেরকে ত্যাগ করতে পারি না এবং আমরা তোমাতে বিশ্বাসী নই। আমরা তো এই বলি, আমাদের ইলাহদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে। সে বললো, আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমরাও সাক্ষী হও যে, আমি তা থেকে নির্লিপ্ত থাকি তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক করা অতএব তোমরা সকলে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত কর এবং আমাকে সুযোগ দিও না। আমি নির্ভর করি আমার ও তোমাদের প্রভু আল্লাহর উপর। এমন কোন জীবজন্তু নেই যে তার পূর্ণ আয়ত্তাধীন নয়, আমার প্রভু আছেন সরল পথে। অতপর তোমরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমি যা নিয়ে তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি তা তো আমি তোমাদের কাছে পৌছিয়ে দিয়েছি এবং আমার প্রভু তোমাদের থেকে ভিন্ন কোন কওমকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন এবং তোমরা তার কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। আমার প্রভু সব কিছুরই রক্ষণাবেক্ষণ করেন।

এবং যখন আমার হুকুম আসল তখন আমি হূদ ও তাঁর সংগে যারা ঈমান এনেছিল তাদেরকে আমার অনুগ্রহে হেফাজত করলাম এবং হেফাজত করলাম তাদেরকে কঠিন আযাব থেকে। এ কওম তাদের প্রভুর নিদর্শন অস্বীকার করেছিল এবঙ অমান্য করেছিল তাঁর রসূলগণকে এবং ওরা প্রত্যেক উদ্ধত স্বৈরাচারীর হুকুম অনুসরণ করত।

এ পৃথিবীতে ওদেরকে করা হয়েছিল অভিশাপগ্রস্ত এবং অভিশাপগ্রস্ত হবে ওরা কিয়ামতের দিবসেও। জেনে রেখ, আদ কওম তাদরে প্রভুকে অস্বীকার করেছিল। জেনে রেখ, ধ্বংসই ছিল হূদের কওম আদের পরিণাম। (সূরা ঃহূদ, আয়াতঃ৬০)

পরে অপর এক কওমকে তাদের স্থলাভিষিক্ত করেছিলাম এবং ওদেরই একজনকে ওদের নিকট রসূল করে প্রেরণ করেয়ছিলাম এবং ওদেরই একজনকে ওদের নিকট রসূল করে প্রেরণ করেয়ছিলাম। সে বলেছিল,তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর,তিনি ছাড়া তোমাদের অপর কোন ইলাহ নেই, তবুও কি তোমরা সাবধান হবে না।

তারা কওমের প্রধানরা, যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল ও পারলৌকিক সাক্ষাৎকারকে অস্বীকার করেছিল এবং যাদেরকে দিয়েছিলাম আমি পার্থিব জীবনে প্রচুর ভোগ সম্ভার, তারা বলেছিল এতো তোমাদেরই মত একজন মানব, তোমরা যা খাও সে তো তা খায় এবং তোমরা যা পান কর সেও তা পান কর; যদি তোমাদের মত একজন মানবের আনুগত্য কর তবে তোমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সে কি তোমাদেরকে এই অঙ্গিকার করে তোমাদের মৃত্যু হলে এবং তোমরা মৃত্তিকা ও অস্থিতে পরিণত হলে তোমাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে। তোমাদেরকে যে বিষয়ে অঙ্গিকার করা হয়েছে তা কখনও ঘটবে না, কখন ঘটবে না। একমাত্র পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন, আমরা মরি বাচি এখানেই আমরা পুনরুত্থিত হব না। সে তো এমন এক ব্যক্তি  যে আল্লাহর সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ধাবন করেছে এবং আমরা তাকে বিশ্বাস করবার নই।  সে বললো, হে আমার প্রভু আমাকে সাহায্য কর, কারণ ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে।আল্লাহ বললেন, অচিরে ওরা অনতপ্ত হবেই। অতপর সত্য সত্যই এক মহা নাদ ওদেরকে আঘাত করে, আমি ওদেরকে তরংগ-তাড়িত আবর্জনা সদৃশ করে দিলাম। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেল সীমালংঘনকারী কওম। (সূরাঃ আল-মু‘মিনুন, আয়াতঃ৩১-৪১)

আদ কওম রসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল। যখন ওদের ভ্রাতা হূদ ওদেরকে বললো, তোমরা কি সাবধান হবে না? আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রসূল। অতএব আল্লাহকে ভয় কর ও আমার আনুগত্য কর। আমি তোমাদের কাছে এজন্য কোন প্রতিদান চাই না, আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রভুর কাছে রয়েছে। তোমরা তো অযথা প্রতিটি উচ্চস্থানে স্তম্ভ তৈরি করছ, তোমরা প্রসাদ নির্মাণ করছ এই মনে করে তোমরা চিরস্থায়ী হবে। আর যখন তোমরা আঘাত হান তখন আঘাত হান নিষ্ঠুরভাবে।তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর। ভয় কর তাকে যিনি তোমাদের দিয়েছেন সেই সমুদয় যা তোমরা অবগত। তোমাদের দিয়েছেন আনআম (চতুষ্পদ জন্তু) ও সন্তান সন্ততি, আমি তোমাদের জন্য আশংকা করি মহাদিবসের আযাব। ওরা বললো, তুমি উপদেশ দাও অথবা না দাও উভয়ই আমাদের কাছে সমান। আমাদের এই সব কর্ম পুর্বপুরুষদের রীতিনীনি মাত্র। আমরা শাস্তি পাব না।

অতপর ওরা, তাকে প্রত্যাখ্যান করল এবং আমি ওদেরকে ধ্বংস করলাম। এতে অবশ্যই আছে নিদর্শন, কিন্তু অধিকাংশই বেঈমান। আর তোমার প্রভু, তিনি তো পরাক্রমশালী পরম দয়ালু। (সূরাঃ আশ শুয়ারাহ, আয়াতঃ ১২৩-১৪০)

আদ কওমের ব্যাপার এ ওরা পৃথিবীতে অযথা দম্ভ করত এবং বলত, আমাদের অপেক্ষা শক্তিশালী কে আছে? ওরা কি তবে লক্ষ্য করেনি আল্লাহ যিনি ওদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি ওদের অপেক্ষাও শক্তিশালী? অথচ ওরা আমার নিদর্শনাবলিকে অস্বীকার করত।

অতপর আমি ওদেরকে ইহলৌকিক জীবনে লাঞ্ছনাদায়ক আযাব আস্ববাদন করার জন্য ওদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্জাবায়ু অশুভ দিনে। পরকালের আযাব তো অধিকতর লাঞ্ছনাদায়ক এবং ওদেরকে সাহায্য করা হবে না।(সূরাঃ হা-মীম সেজদাহ, আয়াতঃ১৫-১৬)

স্মরণ কর আদ কওমের ভ্রাতা হূদের কথা, যার পূর্বে এবং পরেও সতর্ককারীরা এসেছিল, সে তার আহইকাফবাসী কওমকে সতর্ক করেছিল। এ বলে, আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত করো না। আমি তোমাদের জন্য মহাদিবসের আযাব আশংকা করছি। ওরা বলেছিল, তুমি কি আমাদেরকে আমাদের দেব দেবীসমূহের পূজা থেকে বিরত করতে এসেছ? তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যার ডর দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস। বে বললো, এর ইলম তো কেবল আল্লাহর কাছে আছে আমি যা নিয়ে প্রেরিত হয়েছি কেবল তাই তোমাদের কাছে প্রচার করি, কিন্তু আমি দেখছি তোমরা এক মূঢ় কওম।

অতপর যখন ওরা দেখল ওদের উপত্যকার দিকে মেষরূপে আযাব এগিয়ে আসতে তখন ওরা বলতে লাগলো, এ মেঘ আমাদের বৃষ্টিদান করবে। হূদ বললো, এটা তে তা, যা তোমারা ত্বরান্বিত করতে চেয়েছ। এতে রয়েছে এক বড় মর্মন্তুদ আযাব-বহনকারী। আল্লাহর হুকুমে এটা সবকিছুকে ধ্বংস করে দেবে।

অতপর ওদের পরিণাম হল এই ওদের বসতিগুলো ছাড়া আর কিছুই রইলো না। এভাবে আমি অপরাধী কওমকে প্রতিফল দিয়ে থাকি। আমি ওদেরকে যে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলাম তোমাদেরকে তা দেই নি, আমি ওদেরকে দিয়েছিলাম কান, চোখ ও হৃদয়; কিন্তু ওদের কান চোখ ও হৃদয় ওদের কোন কাজে আসে নি, কেননা ওরা আল্লাহর নির্দেশনাবলী অস্বীকার করেছিল। যা নিয়ে ওরা ঠাট্টা বিদ্রুপ করত তাই ওদেরকে ঘিরে ফেললো। (সূরাঃ আল-আহকাব, আয়াতঃ২১-২৬)

এবং নিদর্শন রয়েছে আদের ঘটনায়, যখন আমি তাদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম বিধ্বংসী বায়ু এটা যার উপর দিয়েই বয়ে গিয়েছিল তাকেই চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল। (সূরাঃ আয-যারিয়াত, আয়াতঃ৪১-৪২)

আদ কওম সত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, ফলে কি কঠোর হয়েছিল আমার আযাব ও সতর্ক বাণী। ওদের উপর আমি প্রেরণ করেছিলাম ঝধ্ঞাবায়ু এক চরম দুর্ভাগ্যের দিকে। মানবকে তা উৎখাত করেছিল উন্মিলিত খেজুর কান্ডের ন্যায়। কি কঠোর ছিল আমার আযাব ও সতর্ক বাণী। (সূরাঃ আল-ক্বামার, আয়াতঃ ১৮-২১)

আদ কওম ধস্বংশ প্রাপ্ত হয়েছিল এক প্রচন্ড ঝব্ঞাবায়ুতে, যা তিনি ওদের উপর প্রবাহিত করিয়েছিলেন সাত রাত ও আট দিন বিরামহীনভাবে; তুমি তখন উপস্থিত থাকলে দেখতে-ওরা সেখায় লুটিয়ে পড়ে আছে সারশূন্য বিক্ষিপ্ত খেজুর কান্ডের ন্যায়। ওদের কারো অস্তিত্ব তুমি দেখতে পাও কি?

তুমি কি দেখনি তোমার প্রভু কি করেছিলেন আদ বংশের ইমাম গোত্রের প্রতি-যারা অধিকারী ছিল সুউচ্চ প্রাসাদের?-যার সমতুল্য কোন দেশে নির্মিত হয় নি। (সূরাঃ আল-ফজর, আয়াতঃ৬-৮)

হযরত হূদের ওফাত

আরববাসীরা হযরত হূদ (আ)- এর ওফাত এবং তার সমাধিস্থল সম্পর্কে পরস্পর-বিরোধী মতামত পোষণ করে থাকে। হাদ্রামাউতবাসীদের দাবি এইআদ কওম ধ্বংস প্রাপ্তির পর হযরত হূদ (আ) হাদরমাউতে হিজরত করে আসেন এবং এখানেই তাঁর ওফাত হয়। বারহূত প্রান্তরের সন্নিকটে মাদরমাউতের পূর্বাংশে তারীম শহর থেকে আনুমানিক দ‘ক্রোশ দূরে তাঁকে সমাহিত করা হয়। হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে হযরত হূদ (আ)-এর সমাধি কাসীবে আহমারে (লাল টিলায়) অবস্থিত এবং এর শিয়রের দিকে একটি ঝাউ বৃক্ষ দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ফিলিস্তিনবাসীদের দাবি এই হযরত হূদ ফিরিস্তিনে সমাহিত হয়েছেন তারা সেখানে তাঁর সমাধি সৌধও বানিয়ে রেখেছে। সেখানে বার্ষিক উরসও অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কিন্তু এই সমস্ত বর্ণনার মধ্যে হাদ্রামাউত সম্পর্কিত বর্ণনাই সঠিক ও যুক্তিসঙ্গত বলে ধারণা হয়। কেননা আদ কওমের বাসভূমি হাদরমাউতের কাছেই ছিল। অতএব যুক্তি একথাই বলে ওদের ধ্বংসপ্রাপ্তির পর হযরত হূদ (আ) কাছাকাছি কোন লোকালয়ে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। আর সে লোকালয় নিশ্চয়ই হাদরমাউত ছিল।

কিছু শিক্ষণীয় বিষয়

আদ কওমের লম্বা চওড়া ঘটনা থেকে যে বিশেষ শিক্ষাটি পাওয়া যায় তা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও এতে আরো বেশ কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমনঃ

(১) যে কেউ আদ কওমের ঘটনা অধ্যায়ন করবে তার মানসচোখে ভেসে উঠবে এমন ব্যক্তিত্ব যিনি ছিলেন ধৈর্য,স্থৈর্য ও গাম্ভীর্যের প্রতিমূর্তি। তাঁর চেহারা থেকে উদ্ভাসিত হত ভদ্রতা ও শালীনতা। তিনি যা বলতেন মেপে-জোঁকে বলতেন। স্বীয় কওমের অশিষ্টতা, অভদ্রতা এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপের উত্তর তিনি দিতেন অধিক ধৈর্য ও স্থৈর্যের সাথে। সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার ঝরে পড়ত তাঁর প্রতিটি কথাবার্তা থেকে। সর্বোপরি তিনি ছিলেন মানবজাতির একান্ত মংগলাকাঙ্ক্ষী। তাঁর কওম বলত, আমরা তো লক্ষ্য করছি তোমাকে একজন নির্বোধ এবং তোমাকে তো আমরা মিথ্যাবাদী মনে করি। (সূরাঃআল-আরাফ, আয়াতঃ৬৬)

কিন্তু তিনি উত্তর দিতেনঃ হে আমার কওম, আমি নির্বোধ নই, আমি তো বিশ্বজগতের প্রভুর রসূল। আমি আমার প্রভুর বাণী তোমাদের কাছে পৌঁচাচ্ছি এবং আমি তোমাদের একজন বিশ্বস্ত উপদেষ্টা। (সূরাঃ আল-আরাফ, আয়াতঃ ৬৭-৬৮)

প্রশ্নোত্তর থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় আল্লাহর সনোনীত দাসরা যখন সত্যসন্ধানী কিংবা পথভ্রষ্টদের সত্য ও ন্যায়ের পথ প্রদর্শন করেন তখন তাঁরা অশিষ্ট ও দুরাচারীদের ঠাট্টা-বিদ্রূপের কোন পরওয়া করেন না। তাঁরা ব্যথিত কিংবা বিরক্ত হয়ে ন্যায় ও সত্য থেকে পরান্মুখ হন না, কিংবা উপদেশ প্রদানের দায়িত্বও ছেড়ে দেন না। বরং তাঁরা অধিক দয়াদ্রচিত্তে ও বিনয় ব্যবহারের মাধ্যমে আত্মিক রোগীদের চিকিৎসাকার্যে নিয়োজিত থাকেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা এই আদেশ-উপদেশ বা মানবসেবার বিনিময়ে জনগণের কাছ থেকে কোন পারিশ্রমিক গ্রহণ করেন না। বরং তাঁদের জীবন বিনিময় বা পারিশ্রমিক গ্রহণের দুর্নাম থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। আমি এর বিনিময়ে তোমাদের কাছে শ্রমফল যাঞ্ঝা করি না। আমার শ্রমফল আছে তাঁর কাছে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। (সূরাঃহুদ, আয়াতঃ৫১)

(২) হযরত হূদ (আ) অধিক আন্তরিকতার সাথে তাঁর কওমকে আল্লাহর একত্বের উপর বিশ্বাস স্থাপনের জন্য উদ্বৃদ্ধ করেন, আল্লাহ অসীম অনুগ্রহে কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ সুখ ও সৌভাগ্যের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু ঐ হতভাগারা তাঁর কথায় ককর্ণপাত করেনি।এর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল তাদের ঐ মুকর্খতাপূর্ণ অন্ধ বিশ্বাস তারা যদি তাদের পূর্ভপুরুষের রীতিনীতি ভংগ করে কিংবা তাদের গড়া এই দেবতাদের অমান্য করে তবে এদের রোষানলে পড়ে তাদের জীবন অভিশপ্ত হয়ে উঠবে।

এ ধ্বংসাত্মক বিশ্বাস যে কওমের অন্তরে বদ্ধমূল হয় সে কওমই তাদের মংগলাকাঙ্ক্ষী, সংস্কারক তথা নবী ও রসূলের সাথে সেই আচরণ করে যা হূদের কওম বা নূহের কওম আপন আপন নবীদের বিরুদ্ধে করেছিল। সত্যিকার সংস্কারক ও নবীদের বিরুদ্ধে দুশমনি বা বিদ্বেষ পোষণের সবচেয়ে বড় কারণ হলো, তাঁরা (সংস্কারক বা নবীরা) কেন পূর্বপুরুষের রীতিনীতির বিরোধিতা করে কিংবা কেন প্রচলিত দেবতাদের বিরুদ্ধে এমন অপমানজনক কথা বলে যাতে এদের রোষানলে পতিত হবার আশংকা থাকে।

গ্রীসের বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসকে বিষের পেয়ালা পান করতে হয়েছিল (প্রাণেদন্ড বরণ করতে হয়েছিল) এজন্য যে, তিনি তাঁর জাতির পূজনীয় বাতিল দেবতাদের অসন্তুষ্টির কোন পরওয়া করেন নি এবং এদের যে বিরাট ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব রয়েছে (?) তাও স্বীকার করেন নি। মোটকথা, এ অন্ধ বিশ্বাস যে কোন জাতির আত্মিক জীবনের পক্ষে মারাত্মক এবং তাদের সাফল্য ও সৌভাগ্যের পক্ষে চিরপ্রতিবন্ধক।

(৩) হযরত হূদ (আ) এবং অপরাপর নবীদের চরিত্রের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নমুনা ছিল এই তাঁরা তাবলীগ ও সত্যপ্রচারের পথে সব সময় অভদ্র আচরণের উত্তর ভদ্র আচরণ দ্বারা এবং তিক্ত কথার উত্তর মিষ্টি কথা দ্বারা দিতেন। তবে পথভ্রষ্টদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতেন সৎকাজের জন্য ‍পুরস্কার এবং অসৎকাজের জন্য তিরস্কার বা আযাব আল্লাহর কাছে নির্দ্ধারিত রয়েছে। উপরন্তু তাঁরা পথভ্রষ্টদেরকে একথাটি বার বার স্মরণ করিয়ে দিতেন যখন কোন কওম সমষ্টিগতভাবে অবাধ্যতা, আল্লাহ দ্রোহিতা ও অত্যাচার-নির্যাতন লিপ্ত হয়ে পড়ে এবং দিনের পর দিন তার পূনরাবৃত্তি করতে থাকে তাদের পরিণাম এই হয়ে থাকে তারা আল্লাহর গযব ও রোষানলে পড়ে ধরাপৃষ্ঠ থেকে একেবারে ধ্বংস হয়ে যায় এবং তাদের স্থলাভিষিক্ত হয় অপর কওম। নূহের জাতি হচ্ছে তারই জাজ্বল্যমান প্রমাণ।

নূহের জাহাজ প্লাবনের পর কোথায় ভিড়েছিল?

ইদরীস (আঃ) বিজ্ঞান ও দার্শনিকদের দৃষ্টিতে

আমাদের ইউটিউব ইউটিব চ্যানেল

Spread the love

Leave a Comment